বুধবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২০

১৯৭১ সালের যুদ্ধে ভারতীয়বিমানবাহী রণতরীর তৎপরতা


যুদ্ধের শুরুতেই ভারতীয়রা পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে এ দু’টি অঞ্চলের উপকূলবর্তী সাগর অবরোধ করার পরিকল্পনা হাতে নেয়। পূর্ব পাকিস্তান অবরোধে পাঠানো হয় ভারতের একমাত্র বিমানবাহী রণতরী ‘আইএনএস বিক্রম’। ‘বিক্রম’ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত ব্রিটেনে তৈরি একটি রণতরী। ১৯৭১ সালের আগে আর কখনো এ বিমানবাহী রণতরী যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। করাচি বন্দর অবরোধে বিক্রমের নেতৃত্বে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। কিন্তু বিক্রমের একটি মূল বয়লার অকার্যকর হওয়ায় এবং বিমান হামলার ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘ সমুদ্র পথ পাড়ি দেয়ার মতো গতি না থাকায় করাচি বন্দর অবরোধের পরিবর্তে এ বিমানবাহী জাহাজকে পূর্বাঞ্চলে পাঠানো হয়। যুদ্ধ ঘোষণার দিন বিক্রম আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের সর্ব উত্তরের প্রান্ত থেকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান সমুদ্র বন্দর চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেয়। বিক্রমকে বাধাদানে পাকিস্তান ‘গাজী’ নামে তাদের একটি সাবমেরিন পাঠায়। গাজী ছিল যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি একটি পুরনো সাবমেরিন। এ সাবমেরিন ভারতের বিশাখাপট্টম পোতাশ্রয়ের আশপাশে মাইন স্থাপন করে। মাইন পুঁততে গিয়ে ভারতীয় ডেস্ট্রয়ার ‘আইএনএস রাজপুত’ থেকে নিক্ষিপ্ত ডেপথ চার্জের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবে পহেলা অথবা ২ ডিসেম্বর গাজী নিমজ্জ্বিত হয়। একজন মৎস্যজীবী বিশাখাপট্টম বন্দরের প্রবেশমুখে সাবমেরিনের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পায়। পরবর্তীতে ভারতীয় নৌবাহিনীর অফিশিয়াল ভাষ্যে বলা হয়, ৪ ডিসেম্বর ইস্টার্ন ফ্লীটের যুদ্ধজাহাজ ‘গাজী’কে ডুবিয়ে দিয়েছে। গাজী নিমজ্জ্বিত হলে বিক্রম নির্বিঘেœ লক্ষ্যস্থলে পৌঁছায়। 
৪ ডিসেম্বর প্রথম বিক্রমের ডেক থেকে জঙ্গিবিমান উড্ডয়ন করে এবং কক্সবাজার ও চিড়িঙ্গায় আঘাত হানে। প্রথম মিশনে ৮টি সী হক বিমান অংশগ্রহণ করে। একইদিন বিকেলে দ্বিতীয় মিশনে চট্টগ্রাম বিমান বন্দরে বোমাবর্ষণ করা হয়। সেদিন রাতে বিক্রম মংলা ও খুলনার উদ্দেশে যাত্রা করে। মংলা, খুলনা ও বরিশালে মিশন শেষ করে এ ভারতীয় বিমানবাহী রণতরী ফের চট্টগ্রামে ফিরে আসে। দ্বিতীয় যাত্রায় বিক্রম থেকে উড্ডয়নকারী বিমানগুলো চট্টগ্রাম পোতাশ্রয়, বিমান বন্দর ও চট্টগ্রামের সংযোগ সড়কগুলোতে বোমাবর্ষণ করে। বোমাবর্ষণ করায় চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙ্গর করা জাহাজগুলো হয়তো উল্টে যায় নয়তো অর্ধ নিমজ্জ্বিত হয়। ফেনীতেও বোমাবর্ষণ করা হয়। ১২ ডিসেম্বর ভারতের অনুমতি নিয়ে ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্সের তিনটি এবং জাতিসংঘের একটি সি-১৩০ হারকিউলিস বিমান কুর্মিটোলা বিমান বন্দরের অক্ষত রানওয়েতে অবতরণ করে এবং ব্রিটিশ ও আমেরিকান নাগরিকদের ঢাকা থেকে সরিয়ে নেয়। ব্রিটিশ বিমানের ক্রু জানায় যে, বিক্রম থেকে উড়ে গিয়ে ভারতীয় বিমান তাদের উপর বোমাবর্ষণ করে। সৌভাগ্যক্রমে বোমা লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ায় তাদের কোনো ক্ষতি হয়নি। ভারতীয় বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চীফ মার্শাল পি. সি. লাল তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘মাই ইয়ার্স উইথ দ্য আইএএফ’-এ তিনি ব্রিটিশ যাত্রীবাহী বিমানে বোমাবর্ষণের সত্যতা স্বীকার করেন। বঙ্গোপসাগরে ভারতীয় নৌবাহিনীর উপস্থিতি ছিল একতরফা। পাকিস্তানের আধুনিক তিনটি সাবমেরিন আরব সাগরে নিয়োজিত থাকায় ভারতীয় নৌবাহিনী পূর্বাঞ্চলে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। পাকিস্তান বেশি জোর দিয়েছিল স্থলযুুদ্ধের উপর । উভচর ও নৌশক্তির সমাবেশ ঘটাতে দেশটি চরমভাবে ব্যর্থ হয়।  
(লেখাটি ‘২৬৭ দিনের মুক্তিযুদ্ধ’ থেকে নেয়া। বইটি প্রকাশ করেছে আফসার ব্রাদার্স)

মেজর (অবঃ) আনোয়ার হোসেন

ইনিই সেই বিখ্যাত মেজর (অবঃ) আনোয়ার হোসেন। পুরো একটা জেনারেশনকে যিনি ইন্সপায়ার্ড করে গিয়েছেন তার লেখা 'হেল কমান্ডো' বইটা দিয়ে। 

এদেশে এমন একটা ছেলেও নাই যে কিনা 'হেল কমান্ডো' বই পড়েছে অথচ জীবনে একবারের জন্যে হলেও কমান্ডো হবার স্বপ্ন দেখে নি। এই একটা বইয়ের মধ্য দিয়েই স্যার হাজারো কিশোরের স্বপ্নে বেচে থাকবেন আজীবন।

(বুকের ডান পাশে সেই সম্মানের এস এস জি ব্রেভেট)

© - Collected Info

ইউরি বেজমেনভ একজন রাশিয়ান গুপ্তচর

ইউরি বেজমেনভ একজন রাশিয়ান গুপ্তচর। স্নায়ু যুদ্ধের সময়ে, ১৯৭০ সালে তিনি পক্ষ ত্যাগ করে রাশিয়া থেকে পশ্চিমের (আমেরিকা/কানাডা) দিকে ঝুঁকে পড়েন। 

১৯৮৪ সালে দেয়া তার একটা বিখ্যাত লেকচার আছে, যেখানে তিনি কেজিবি কিভাবে, গুপ্তচরবৃত্তিতে সাবভারশান ব্যবহার করে, তার একটা চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন।

তিনি বলছেন, অনেকে মনে করে,একটা দেশে কি অস্ত্র সস্ত্র আছে, গোপন তথ্য চুরি, গোপন স্থাপনার খবর নেয়া- এই গুলো হচ্ছে গুপ্তচর বৃত্তি। 
উনি বলছেন, এই গুলো হলিউডি জেমস বন্ড টাইপের ধারনা। কিন্ত এর কোন বাস্তবতা নাই।

তিনি বলেছেন, গুপ্তচর বৃত্তির সর্বোচ্চ আর্ট হচ্ছে, সাবভারশান। যেইটা গুপ্তচরবৃত্তির আল্টিমেট পারপাস, যা একটা গুলি ছোড়া ছাড়াই অর্জন করা যায়। সাবভারশানের মুল কাজ গুলো বৈধ। এবং এইটা রাষ্ট্রের নিজের নাগরিকদেরকে দিয়েই অর্জন করা যায়। গুপ্তচর লাগেনা।

তিনি বলছেন, সাবভারশনের চারটা স্টেজ আছে,

১। ডিমরালাইজেশান।

এই ডিমরালাইজ করতে ১৫ থেকে ২০ বছর লাগে। কেন ২০ বছর লাগে ? তিনি বলেছেন, এই সময়ের মধ্যে একটা জেনারেশানের চিন্তাকে শেপ করা যায়, তার শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা যায়।

ডিমরালাইজেশানে থাকে, ইনফিল্ট্রেশান বা প্রোপাগান্ডা। যার মাধ্যমে বিভিন্ন ভাবে, ছয়টা জিনিষকে আক্রমন করা হয়। 

ক। ধর্ম। ধর্মীয় ভ্যালুকে ধ্বংস করা।

খ। এডুকেশান । 

শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে, প্রকৃত জ্ঞানকে ধ্বংস করা হয়। সাইন্স, ফিজিক্স,বিদেশী ভাষা , ক্যামিস্ট্রি , ম্যাথমেটিক্সের বদলে ইতিহাস, যুদ্ধ, হোমইকনমিক্স, যৌন শিক্ষা ইত্যাদির উপরে গুরুত্ব নিয়ে আসা হয়।

গ। সামাজিক জীবন।

স্বাভাবিক সামাজিক জীবনকে ধ্বংস করতে রাষ্ট্রের মধ্যে আদর্শিক বিরোধ তৈরি করা হয়। এবং এমন একটা সমাজ সৃষ্টি করা হয়, যেখানে আদর্শিক কারনে ক্রিমিনালকে সমাজ আর ক্রিমিনাল বলবে না,ক্রিমিনালকে কিছু লোক বা সমাজের বড় একটা অংশ শ্রদ্ধা করবে।

ঘ। ক্ষমতার বিন্যাস

জনগণের ইচ্ছায় ক্ষমতা নিরধারনকে ধ্বংস করে, অস্ত্র এবং শক্তি দিয়ে ক্ষমতার আরোহণ অবরোহণের পথ তৈরি করা হয়। আরটিফিসিয়াল ক্ষমতা তৈরি করে অযোগ্য নেতৃত্বকে অধিষ্ঠিত করা হয়, যে বলে দিবে, কে ভালো কে খারাপ। সমাজ নিজে থেকে ভালো খারাপ আর নিধারন করতে পারেনা।

ঙ। শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক,

মালিক শ্রমিক সম্পর্কে বারগেনের বা নেগশিয়াশানের জায়গা নষ্ট করে, মালিক পক্ষের পূর্ণ কর্তৃত্ব স্থাপন করা হয়। বারগেনের মাধ্যমে কম্প্রমাইজের পরিবেশ নষ্ট করে, মালিক শ্রমিক সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাস এবং ঘৃণা সৃষ্টি করা হয়।
এবং শ্রমিকদের আয় বৃদ্ধি পেলেও, শ্রমিকরা যেন লিভিং ওয়েজ পেতে না পারে সেইটা নিশ্চিত করা হয়।

চ। ল এন্ড অর্ডার ।

মানুষের বিচার পাওয়ার , কনফ্লিক্ট রেজুলিউশান হওয়ার রাস্তা সম্পূর্ণ ভাবে ধ্বংস করে দেয়া হয়, যেন, মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়।
এই কাজ গুলো করে, দেশের সকল প্রতিষ্ঠানকে ডিমরেলাইজ করা হচ্ছে, এই ফেজের উদ্দেশ্য। বেজমেনভের মতে এই কাজ গুলো কিন্ত, গুপ্তচরেরা করেনা। এই কাজ গুলো কিন্ত দেশের নাগরিকদের হাতেই সম্পন্ন করা হয়।

২। ডিমরালাইজেশানের পরের স্টেজ হচ্ছে, ডিস্টেবািলাইজেশান।

এই পর্যায়ে গিয়ে দেশে আর কোন কনফ্লিক্ট রেজুলেশান হয়না। নিজেদের মধ্যে সংঘাত বিরোধ এবং মারামারি বাদে কেউ কম্প্রোমাইজ করতে পারেনা,।

এই সময়ে হিউম্যান রিলেশানকে র‍্যাডিকালাইজ করা হয়। টিচারের সাথে ছাত্র, মালিক শ্রমিক সম্পর্ক, যাত্রির সাথে পরিবহন শ্রমিকের সম্পর্ক সকল লেভেলে একজন আরেকজনকে ঘৃণা করবে।

এই সময়ে মিলিটারাইজেশানও হবে। এমনকি নাগরিকের মধ্যেও মিলিটারাইজেশান হবে। সামান্য ইসুতে একজন আরেক জনকে শুট করবে। মিডিয়াকে নাগরিক তার প্রতিপক্ষ মনে করবে।

নাগরিকের অধিকারের বদলে, অপ্রয়োজনীয় আদর্শিক ইস্যুকে রাষ্ট্রের প্রধান ইস্যুতে পরিণত করা হবে, যেই গুলো নিয়ে নাগরিক নিজেদের মধ্যে মারামারি করবে।
এই সময়ে বিভিন্ন আরটিফিশিয়াল এন্টিটি ক্ষমতা দাবী করবে। এবং রাষ্ট্র তাদেরকে বিভিন্ন ভাবে ক্ষমতার হালুয়া রুটির ভাগ দিবে।

৩। ক্রাইসিস।

থার্ড স্টেজে এসে পপুলেশান এখন সমাধান খুজবে। একটা শক্তিশালী সরকার খুজবে। একজন নেতা খুজবে, যে রাষ্ট্রের এই সমস্যা গুলোকে সমাধান করতে পারবে।
এই নেতাকে অপরিসীম ক্ষমতা দেয়া হবে। নইলে রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পরার বা সিভিল ওয়ারের ভয় থাকবে।

৪। নরমালাইজেশান।

এই নেতা রাষ্ট্রের এই নেতা কঠোর ভাবে, আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রন করবে। তিনি স্টাবিলিটির নাম দিয়ে, সব কিছু নিজস্ব বাহিনী দিয়ে নিয়ন্ত্রন করবে। কিন্ত, সমাজের আর কারো , তার কোন কিছুর বিরোধিতা করার সুযোগ থাকবেনা।

এই সময়ে আর কোন স্ট্রাইক হবেনা। সবাই একটা ফ্রিডমের ভাবের মধ্যে থাকবে। কিন্ত, তার আর কোন স্বাধীনতা থাকবেনা। সব কিছু ভেঙ্গে পরলেও সবাই নীরব থাকবে। সবাই, একটা ডিজফানশনাল জীবন যাপন করবে কিন্ত, সেইটাকে নরমাল ভাববে।

ইন্টেরেস্টিংলি, লিঙ্কে দেয়া ১৯৮৪ সালের এই ভিডিওটিতে বেজমেনভ, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুকেও উদাহরন হিসেবে এনেছে।

একজন রাশিয়ান ডিফেক্টর হিসেবে তার মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ান নিয়ে অনেক ঘৃণা আছে এই ভিডিওতে। ফলে, সেই দিকে আমরা যাবোনা। কিন্ত, বেজমেনভের এই তথ্য গুলো দিয়ে স্নায়ু যুদ্ধের সময়ের পৃথিবীর আন্ত রাষ্ট্রীয় এস্পিয়নাজকে বোঝা যায়।
বলাই বাহুল্য, স্নায়ু যুদ্ধের পরে, এখন এই গুলোর আর কোন প্রয়োগ কিনা, তা' নিজেকেই প্রশ্ন করতে হবে। তবুও আমরা একাডেমিক আলোচনার জন্যে বিষয় গুলো জানলাম।

কেউ বর্তমান বাংলাদেশের সাথে এর তুলনা করবেন না। কারণ, আবার বলছি এইটা একটা একাডেমিক আলোচনা। যদিও একাডেমিক আলোচনার খাতিরে, চিন্তার করার সুযোগে আছে, বাংলাদেশ, বর্তমানে, ডিমরালাইজ স্টেজে আছে, নাকি নরমালাইজ স্টেজে আছে। কিন্ত, এই ধরনের কস্ট কল্পনা করে, বা বর্তমান জিপিএ ফাইভের মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করাটাকে সাবভাসিভ এক্টিভিটি হিসেবে তুলনা করলে, আপনার কস্ট কল্পনার দায় আপনার।

কালেক্টেড

ইয়াতাগান

ইয়াতাগান এক ধরনের তুর্কী তলোয়ার যা ১৬ থেকে ১৯ শতকের শেষ পর্যন্ত তুর্কী মুসলিমরা ব্যবহার করে এসেছে। এই ইয়াতাগান তলোয়ারের ধার এতই যে আধুনিক কোন ব্লেড এই তলোয়ারের আঘাতে ২ টুকরো হয়ে যাবে। একেকটি ইয়াতাগান ৬০ থেকে ৭০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। 
ইয়াতাগানগুলোর গায়ে খুদাই করা হত মহান আল্লাহর নাম বা নবীজীর প্রতি দরুদ শরীফ খোদাই করা থাকত। 
মহান উসমানীয় সালতানাতের এলিট ফোর্স জেনিসারীরা এই ইয়াতাগান ব্যবহার করতো।
--সংগ্রহীত

|| পোশাক দেখেই স্প্যানিশ সেনাদলের পলায়ন ||


সময়টা ছিল মুসলিম সাম্রাজ্যের উসমানি খেলাফতের সুলতান সুলায়মানের সময়কাল। হল্যান্ডের রাজা 'স্যার থমাস মোর' বা 'ছোট হ্যান্স হুলব্যান' শুনতে পেলেন, হল্যান্ডের উপর আক্রমণের উদ্দেশ্যে স্পেন সম্রাট তার বিশাল সেনাবাহিনীকে হল্যান্ড অভিমুখে যাত্রার নির্দেশ দিয়েছেন। খবরটা হল্যান্ড রাজাকে হতবিহবল করে দেয়। আচমকা এ হামলার মোকাবিলা করার সামর্থ্য না থাকায় হল্যান্ড রাজা উসমানি খেলাফতের ভূমিতে অবস্থানরত তাদের রাষ্ট্রদূতের কাছে চিঠি লিখলেন। চিঠিতে তিনি সুলতান সুলায়মানের কাছে মাত্র চল্লিশজন উসমানি সেনা পাঠানোর জন্য সাহায্য কামনা করলেন। 
-
চিঠিটা পেয়েই দূত অতি দ্রুত ইস্তাম্বুল অভিমুখে রওয়ানা হল। রাজমহলে পৌঁছেই সে মহাপ্রতাপধর সম্রাট, খলিফাতুল মুসলিমিন সুলতান সুলায়মানের সাক্ষাৎ চাইলো। রাজমহলের বাগানে এসে চিঠিটা সে সুলতানের উজিরে আজম ইবরাহিম পাশার হাতে দিল। 
-
সুলতান সুলায়মান উজিরে আজমকে চিঠি পড়তে আদেশ করলেন। উজিরে আজম পড়তে লাগলেন—
-
"হল্যান্ড সম্রাটের পক্ষ থেকে উসমানি সুলতানের প্রতি! আপনি যদি অনুগ্রহপূর্বক আমাকে আপনার বিশেষ বাহিনী থেকে মাত্র চল্লিশজন সেনা প্রদান করেন, তাহলে আমি আপনাকে বার্ষিক ১৬ হাজার লিরা (তখনকার মুদ্রা) কর প্রদান করব। আপনি কি তা চান না?"
-
উজিরে আজম ইবরাহিম পাশা চিঠি পড়া শেষ করে নিজে থেকে এই পরামর্শ দিলেন, "জাহাপনা! উসমানি সেনাবাহিনী থেকে বাছাই করে চল্লিশজন 'জেনোসারি' সৈন্য পাঠিয়ে দিন। তাহলে বার্ষিক ১৬ হাজার লিরা কর হিসেবে পাবেন, যা উসমানি কোষাগারে অনেক কল্যাণ বয়ে আনবে।"
-
উজিরে আজমের পরামর্শ শুনে সুলতান সুলায়মান বললেন, 'আগামীকাল আমি পত্রের জবাব দিব৷ সে পর্যন্ত আমাকে ভাবতে দাও।' পরদিন সকাল হলে দূত সুলতানের কাছে এসে হাজির। সুলতান তার দিকে বাড়িয়ে দিলেন একখানা চিঠি। দূত চিঠি খুলে পড়তে শুরু করল। চিঠি পড়া শেষ হলে রাষ্ট্রদূত একেবারে চুপ মেরে বসে রইল। তার মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হচ্ছিল না। সে বড় বড় চোখে কেবল সুলতানের দিকে তাকাচ্ছিল।
-
সুলতান তার আশ্চর্যের পরিধি অনুভব করতে পেরে বললেন, 'এখানে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই। যাও, তোমার সম্রাটকে গিয়ে বলবে, তিনি যেন চিঠিতে উল্লেখিত পন্থা অনুসরণ করেন। এরপরই না ফলাফল দেখতে পারবেন।' চিঠিতে লেখা ছিল—
-
"তিন মহাদেশের শাসক মহান সুলতান সুলায়মানের পক্ষ থেকে হল্যান্ড সম্রাটের প্রতি!
-
আপনাকে আমার বিশেষ চল্লিশজন 'জেনোসারি' সৈন্য প্রদান করবো না, বরং আমি আমার চল্লিশজন জেনোসরি সৈন্যের যুদ্ধের পোশাক প্রেরণ করব। এসব পোশাক আপনি আপনার চল্লিশজন সৈন্যকে পরিয়ে দিবেন। দেখবেন স্পেনিশরা কীভাবে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে পলায়ন করে।"
-
তাই করেছিলেন হল্যান্ডের সম্রাট। আক্রান্ত হবার আগেই তিনি তার বিশেষ চল্লিশজন সৈন্যকে উসমানি বাহিনীর জেনোসারি সৈন্যের যুদ্ধের পোশাক পরিয়ে দেন। অতঃপর এই চল্লিশজনকে সম্মুখের কাতারে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে রাখেন। 
-
যুদ্ধের ময়দানে যখন স্পেনিশরা হল্যান্ড সৈন্যদের সামনের কাতারে উসমানি 'জেনোসারি' সৈন্য দেখে একেবারে ভড়কে যায়। হল্যান্ড বিজয় করার জন্য যে মনোবল নিয়ে তারা এসেছিল, তা মুহূর্তেই উবে যায়! কালবিলম্ব না করে তৎক্ষনাৎ মাঠ ছেড়ে স্পেনের পথে পলায়ন করে ওই কাপুরুষরা!
-
স্পেনিশ সৈন্যরা তাদের দেশে পৌঁছে যাওয়ার পর হল্যান্ড সম্রাট একটি সিন্ধুকের ভিতর তিন বছরের বার্ষিক করসহ চল্লিশটা যুদ্ধের পোশাক ফেরত পাঠালেন সুলতান সুলায়মানের দরবারে।
---------------------------------------------

সূত্রঃ উসমানি খেলাফতের স্বর্ণকণিকা।

টেলিস্কোপ

♦♦মহাকাশের দিকে তাকালে আমাদের মনে হাজারো প্রশ্ন জাগে। যেমন এই তারাটি দেখতে কেমন বা কত বড়?।তবে এতো বড় স্বপ্নের মধ্যে আমাদের দৌড় ২৩ বিলিয়ন কিলোমিটার পর্যন্ত।পৃথিবীতে আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যার সূচনা হয় সেই তিন শতাব্দী আগে। টেলিস্কোপ আবিষ্কার করে টেলিস্কোপ যুগের সূচনা করেছিলেন গ্যালিলিও গ্যালিলি। ফলে বিজ্ঞানীরা নতুনভাবে আকাশ দেখতে সক্ষম হলেন।এরপর নিউটন আবিষ্কার করলেন প্রতিফলক টেলিস্কোপ। তারপর বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকের প্রথম দিকে বিজ্ঞানীরা পরিচিত হলে রেডিও এস্ট্রোনমির সাথে। 

♦কিন্তু সমস্যা ছিল যে পৃথিবীতে থাকা টেলিস্কোপ দিয়ে মহাকাশের দৃশ্য ভালোভাবে দেখা যেত না। আবার অনেক রশ্মি ছিল যে পৃথিবীতে আসার আগেই বায়ুমণ্ডলে শোষিত হয়ে যেত। তাই বিজ্ঞানীরা মহাকাশের বাইরে টেলিস্কোপ পাঠানোর প্রয়োজনবোধ করলেন। এরই ধারাবাহিকতায় মহাশূন্যে স্থাপিত হয়েছে হাবল, চন্দ্রা, স্পিটজার ইত্যাদির মতো যুগান্তকারী সব স্পেস টেলিস্কোপ।

♦স্পেস টেলিস্কোপগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নজর কাড়ে হাবল স্পেস স্যাটেলাইট টেলিস্কোপ।১৯৯০ সালের এপ্রিলে পৃথিবী থেকে ৬০০ কি.মি উপরে লোয়ার আর্থ অরবিটে একে স্থাপন করা হয়। জ্যোতির্বিদ এডুইন হাবলের নামে এর নামকরণ করা হয়। হাবল মূলত ৯৪.৪৮ ইঞ্চি ব্যাসের একটি প্রতিফলন টেলিস্কোপ। আয়নাটির পুরুত্ব মাত্র ১০ ন্যানোমিটার! শুরুতে এর প্রতিফলক আয়নায় সমস্যা দেখা দিয়েছিল। তাই উৎক্ষেপণের তিন বছরের মাথায় বিজ্ঞানীরা স্পেস শাটলে করে এর আয়নাটিকে মেরামত করে দেন। এরপর আর হাবলকে ঠেকায় কে?। মহাকাশের হাজার হাজার দুর্দান্ত ছবি তুলে চলেছে হাবল, যা মহাকাশ গবেষণায় বিপ্লব ঘটায়। আসলে একে মেরামত করতে করতে এর সব যন্ত্রপাতিই এখনকার আধুনিক যন্ত্রপাতি। তাই হাবল এখন সেই নব্বইয়ের দশকের হাবল নয়। হাবলের জন্য জ্যোতির্বিদ্যার যে কতো অগ্রগতি সাধিত হয়েছে তা বলার মতো নয়। এর সাহায্যে প্রাপ্ত তথ্য দিয়ে ২০১০ সাল পর্যন্ত ৮ হাজার জার্নাল পেপার প্রকাশিত হয়েছে! বিশ্বের বয়স, গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ, সুপারনোভাদের দুরত্ব, ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্বের প্রমাণ ইত্যাদি হাজারো বিষয়ে সাহায্য করেছে হাবল। মহাকাশপ্রেমীদের সবচেয়ে প্রিয় টেলিস্কোপ হচ্ছে হাবল টেলিস্কোপ। আধুনিক মহাকাশবিজ্ঞানে এর অভূতপূর্ব অবদান অনস্বীকার্য। আর এই হাবলের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে আসছে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ!

♦মার্কিন মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান নাসার ( NASA ) নেতৃত্বে প্রায় ৮৮০ কোটি ডলার ব্যয়ে স্পেস টেলিস্কোপ জেমস ওয়েব তৈরির কাজ প্রায় শেষের পথে।সম্ভবত ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির ( ESA ) রকেট আরিয়ান-৫ এর সাহায্যে আগামী বছরেই মানে ২০২১ সালে উৎক্ষেপণ করা হবে স্পেস টেলিস্কোপের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় টেলিস্কোপটি। রকেটের পেলোড কম্পার্টমেন্টে টেলিস্কোপটি আয়নাগুলো গুটিয়ে রাখবে। প্রায় ১৮টি টুকরার সমন্বয়ে তৈরি স্যাটেলাইটটির প্রতিফলক আয়না তৈরি হয়েছে হয়েছে বেরিলিয়াম দিয়ে। কারণ বেরিলিয়াম প্রচলিত আয়নার চেয়ে ঠান্ডায় সংকুচিত হয় কম। আয়নাগুলো বসাবার স্থানটি ২৪ ক্যারেট সোনা দিয়ে বাঁধানো থাকবে। কারণ সোনার ইনফ্রারেড রশ্মি প্রতিফলনের ক্ষমতা বেশি। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫,১৩,৪০০ কি.মি উপরে ল্যাগরেজ পয়েন্টে স্থাপিত হবে। অর্থাৎ চাঁদের চেয়েও প্রায় ৫ গুণ দুরত্বে! জেমস ওয়েবের মূল যন্ত্রপাতি ৪টি। হাবল এবং স্পিটজারের তুলনায় জেমস ওয়েব যথাক্রমে ৩ ও ৮ গুণ শক্তিশালী হবে। হাবলের সাহায্যে আমরা বিগ ব্যাংয়ের ৮০০ মিলিয়ন বছর পরের ছবি দেখতে পেরেছি। কিন্তু বিজ্ঞানীরা প্রত্যাশা করছেন যে, জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের মাধ্যমে আমরা বিগ ব্যাংয়ের ২০০ মিলিয়ন বছর পরের ছবি দেখতে পাবো। ইনফ্রারেড-রে বা অবলোহিত রশ্মি ডিটেক্ট করে জেমস ওয়েব এক্সোপ্লানেট নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু গবেষণায় সাহায্য করবে। এছাড়াও মহাবিশ্ব সৃষ্টির রহস্য, নক্ষত্র সৃষ্টির রহস্য, মহাবিশ্বের বয়সের মতো হাবল যেমন হাজারো তথ্য দিয়েছে, জেমস ওয়েব এর চেয়েও বেশি সাহায্য করবে বলে বিজ্ঞানীরা আশা করছেন।

ঢাকা দখলের নায়ক জেনারেল জ্যাকবের বর্ণনা


পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা দখলের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন মেজর জেনারেল জ্যাকব। ভারতীয়দের মতে, গোর্খা ক্যাপ পরিহিত বিশাল গোঁফের অধিকারী পার্সি জেনারেল মানেকশ ও শিখ জেনারেল অরোরার চেয়ে পদমর্যাদায় নিচে অবস্থানকারী ইহুদী মেজর জেনারেল ফ্রেডারিক রালফ জ্যাকবই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নিষ্পত্তিকারী ভূমিকা পালন করেন। 
১৯৭১ সালে মুক্তিয্ুেদ্ধ মেজর জেনারেল জ্যাকব সীমান্তের ওপার থেকে ভারতীয় সৈন্যদের বাংলাদেশের গভীর অভ্যন্তরে পৌঁছতে নেতৃত্ব দানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণ করে জেনারেল জ্যাকব উপলব্ধি করতে সক্ষম হন যে, যুদ্ধ অনিবার্য। তার পরিকল্পনা ছিল পাকিস্তানি বাহিনীকে এড়িয়ে সরাসরি পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা দখল। ঊর্ধŸতন ভারতীয় কমান্ডারগণ তার পরিকল্পনার বিরোধিতা করেন। অবশেষে তার পরিকল্পনা গৃহীত হয়। পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণে তিনি বিরাট অবদান রেখেছিলেন। তিনি হলেন এ ঐতিহাসিক ঘটনার একজন সাক্ষী ও কুশীলব। তিনি তার নিজের লেখা বই ‘স্যারেন্ডার অ্যাট ঢাকা: বার্থ অব অ্যা নেশন’-এ সেদিনকার ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তার বইয়ের বাংলা অনুবাদ অনুসরণে নিচে তা তুলে ধরা হলো। 
‘১৪ ডিসেম্বর আনুমানিক বিকেল পাঁচটায় কলকাতাস্থ মার্কিন কন্স্যুলার অফিসের কূটনীতিক স্পিভ্যাকের সঙ্গে নিয়াজির ভাষায় যুদ্ধবিরতি অথবা আত্মসমর্পণের প্রস্তাবনা নিয়ে তার আলোচনার কথা আমাকে জানান। সঙ্গে সঙ্গে আমি কলকাতাস্থ যুক্তরাষ্ট্রের কন্সাল জেনারেল হার্বার্ট গর্ডনের কাছে ফোন করি। তিনি এ বিষয়ে তার অবগতির কথা অস্বীকার করেন। আমি তাকে আবার একটু পরীক্ষা করে দেখার কথা বলতেই তিনি বললেন, ‘জেক, সত্যি বলছি, নিয়াজির অনুরোধ সম্পর্কে আমি আসলে কিছুই জানি না।’ তারপরও আমি জেনারেল মানেকশকে ফোন করে তাকে দিলি¬স্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করি। তথ্যটি সঠিক কিনা সে বিষয়ে মানেকশ আমাকে প্রশ্ন করলে আমি তাকে জানাই যে, একজন দায়িত্বশীল পদস্থ কর্মকর্তা আমাকে ফোনে একথা জানিয়েছেন এবং আমি তাকে বিশ্বাস করি। আমি নিয়াজির সঙ্গে আবার যোগাযোগের চেষ্টা করবো বলে তাকে জানাই। জেনারেল মানেকশ মার্কিন রাষ্ট্র্রদূতের সঙ্গে কথা বলেন এবং জানান, জেনারেল নিয়াজি স্পিভ্যাকের কাছে কোনো অনুরোধ করেছেন কিনা মার্কিন রাষ্ট্রদূত তার কিছুই জানেন না। আপাতদৃষ্টে মনে হলো স্পিভ্যাক বার্তাটি ইসলামাবাদে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কাছে পাঠিয়েছেন এবং ইসলামাবাদস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত পরবর্তীতে তা ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে পাঠিয়ে দিয়েছেন। পরে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার স্বীকার করেন যে, পররাষ্ট্র দপ্তরে নিয়াজির বার্তাটি একদিন ধরে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যাতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার আগে পাকিস্তানিরা পশ্চিমে আরো কিছু এলাকার দখল নিতে পারে। 
জেনারেল মানেকশ বার্তাটি পান ১৫ ডিসেম্বর। তিনি নিশ্চয়তা দেন যে, পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করলে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। এ বিষয়ে পাকিস্তান ইস্টার্ন কমান্ডকে ফোর্ট উইলিয়ামে ইস্টার্ন কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। পাকিস্তানি কমান্ডার-ইন-চীফ এই শর্ত গ্রহণ করার জন্য নিয়াজিকে সংকেত দেন। ১৫ ডিসেম্বর বিকাল পাঁচটা থেকে পরদিন বেলা ৯ টা পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির জন্য উভয়পক্ষ রাজি হয়। পরবর্তীতে এই মেয়াদ বিকাল তিনটা পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়। ধারণা করা হচ্ছিল প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিলেন। হাসান জহির তার ‘দ্য সেপারেশন অব ইস্ট পাকিস্তান’-এ স্স্পুষ্টভাবে উলে¬খ করেছেন যে, পাকিস্তানিরা ‘আত্মসমর্পণ’ শব্দটি পরিহারের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিল। ঢাকায় আত্মসমর্পণ নিয়ে আলোচনার সময় নিয়াজি আশা করেছিলেন স্পিভ্যাককে দেয়া তার প্রস্তাব অনুযায়ী দলিল তৈরি করা হবে। সম্ভবত এ কারণেই পরবর্তীতে ঢাকায় আত্মসমর্পণের দলিল দেখার পরও তিনি তা গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন।
১৬ ডিসেম্বর সকাল সোয়া ৯টায় জেনারেল মানেকশ ফোনে আমাকে অবিলম্বে ঢাকায় গিয়ে সেদিন সন্ধ্যার মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের যাবতীয় ব্যবস্থা স¤পন্ন করতে বলেন। আমরা তার আগে আত্মসমর্পণের যে খসড়া দলিল পাঠিয়েছিলাম তা অনুমোদিত হয়েছে কিনা তা জানতে চাইলে প্রশ্নটি তিনি কৌশলে এড়িয়ে যান। আমি তখন জানতে চাইলাম, সুনির্দিষ্টভাবে কোন কোন বিষয়ে কী কাঠামোতে আমি আলোচনা করবো। উত্তরে তিনি আমাকে বেশি ঝামেলা বাধাতে নিষেধ করে বললেন, কী করতে হবে আমি তা ভালোভাবেই বুঝি। তিনি ব্রিগেডিয়ার সেথনাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে পাঠানোর কথা বললেন। আরো বললেন, তার হাতে থাকবে টাইপ করা একটি দলিল। ব্রিগেডিয়ার সেথনা এ দলিল অরোরার হাতে দেবেন। অরোরা সেই দলিল নিয়েই ঢাকা যাবেন। 
মানেকশকে জানালাম আমি একটি রেডিও মেসেজ পেয়েছি এবং তাতে নিয়াজি আমাকে লাঞ্চের নিমন্ত্রণ করেছেন। তিনি বললেন, নিমন্ত্রণ গ্রহণ করা উচিত কিনা তাও তিনি আমাকে জানাবেন। অরোরাকে আমি এ বিষয়ে ব্রিফ করে ঢাকায় যাবার প্রস্তুতি গ্রহণ করলাম। গোয়েন্দা বিভাগের কর্নেল খারা ও বিমান বাহিনীর অগ্রবর্তী হেডকোয়ার্টার্সের এয়ার কমোডর পুরুষোত্তমকে আমার সঙ্গে যেতে বললাম। তার আগে আত্মসমর্পণের যে খসড়া দলিল অনুমোদনের জন্য দিলি¬তে পাঠিয়েছিলাম তার একটি কপি আমাদের সঙ্গে নিয়ে নেই।
ব্রিগেডিয়ার সেথনাকে ব্রিফ করে তাকে ভারতীয় ও বিদেশী সাংবাদিকদের জন্য হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা করতে বললাম। তাকে আরো বললাম, ইস্টার্ন কমান্ডের সেনাবাহিনী প্রধান ছাড়াও নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনী প্রধানরা এতে যোগদান করছেন। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী থেকে কর্নেল ওসমানী ও উইং কমান্ডার খন্দকার যেন উপস্থিত থাকেন, তাও নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য আত্মসমর্পণের আলোচনার বিষয়টি সেথনা সমস্ত সেনা স্থাপনাকে জানিয়ে দেন এবং যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে বলেন।  হেলিপ্যাডের দিকে যাবার পথে সিঁড়ি দিয়ে নামতেই মিসেস ভান্তি অরোরার সঙ্গে দেখা। তিনি বললেন, ঢাকায় আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠানে আমার সঙ্গে তার দেখা হবে। আমি ভাবলাম তিনি হয়তো আমার সঙ্গে রসিকতা করছেন। আমার অভিব্যক্তিতে বিস্ময় লক্ষ্য করে তিনি বললেন, ‘আমি বসবো আমার কর্তার পাশে।’ আমি দ্রুত অরোরার অফিসে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, সত্যিই তিনি তার স্ত্রীকে এই অনুষ্ঠানে নিয়ে যাচ্ছেন কিনা। জবাবে তিনি বললেন, তিনি মানেকশর অনুমোদন নিয়েছেন। আমি বললাম, ঢাকায় এখনো লড়াই চলছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। এই অবস্থায় কোনো মহিলাকে সেখানে নিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। বাঁকা সুরে তিনি উত্তর দিলেন, ঢাকায় তার নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব আমার। আমি বুঝে গেলাম, এ নিয়ে তর্ক করা বৃথা। আমি নিজের কাজে চলে গেলাম।
যশোরে আমরা হেলিকপ্টার পরিবর্তন করতে নামলে আর্মি হেডকোয়ার্টার্স থেকে পাঠানো একটি বার্তা আমাকে দেয়া হয়। তাতে বলা হয়েছে, সরকার আমাকে নিয়াজির লাঞ্চের নিমন্ত্রণ গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছে। আত্মসমর্পণের দলিলের খসড়ার অনুমোদন সম্পর্কিত কোনো বার্তা তখনো আমি পাইনি। দূর থেকে গোলাবর্ষণের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। ঢাকা বিমান বন্দরের প্রবেশ মুখে এসে আমরা একটি হেলিকপ্টারকে বিদায় নিতে দেখি। টারমাকে ১৮ জন পাকিস্তানি সৈন্য লাইন দিয়ে দাঁড়ানো। বিমান বিধ্বংসী কামান আমাদের হেলিকপ্টারের দিকে তাক করা। তাও আমরা লক্ষ্য করি। এয়ার কমোডর ফিরে যেতে চাইলেও পাইলটকে আমি ল্যান্ড করার নির্দেশ দিই। পাকিস্তান ইস্টার্ন কমান্ডের চীফ অব স্টাফ ব্রিগেডিয়ার বাকির সিদ্দিকী আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ঢাকাস্থ জাতিসংঘ প্রতিনিধিও সেখানে উপস্থিত। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে আলোচনায় তার অফিস ব্যবহারের জন্য তিনি প্রস্তাব দেন। কিন্তু আমি চাইনি জাতিসংঘ এতে কোনোভাবে জড়িত হোক। কেননা আমি মনে করতাম সমস্যায় তাদের কিছু করণীয় নেই। এয়ার কমোডর পুরুষোত্তমকে আমি পাকিস্তান এয়ার ফোর্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে অরোরা ও তার সফর সঙ্গীদের নিরাপদ অবতরণ নিশ্চিত করতে বললাম। টারমাকের উপরে ১৮টি বিমান সম্পর্কে আমি তাকে ঠাট্টা করি। এ বিমানগুলো ভূপাতিত অথবা ধ্বংস হওয়ার খবর আমরা শুনেছিলাম। ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিকী, কর্নেল এমএস খারা ও আমি গাড়িতে করে নিয়াজির হেডকোয়ার্টার্সে যাই। পথে মুক্তিবাহিনী আমাদেরকে থামায়। তারা ছিল খুবই জঙ্গি মেজাজে এবং যে কোনো রকমের ভাংচুর শুরু করার জন্য তৈরি ছিল। তাদের সঙ্গে ছিলেন বিদেশী সংবাদ সংস্থার কয়েকজন প্রতিনিধি। আমি তাদের বুঝানোর চেষ্টা করি যে, যুদ্ধ শেষ এবং রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করবে। এতে তারা উত্তেজিত হয়ে চেঁচামেচি শুরু করে এবং পাকিস্তানি কমান্ড হেডকোয়ার্টার্স দখল করে নিয়াজি ও তার অনুচরদের পাওনা কড়ায় গণ্ডায় বুঝিয়ে দিতে চায়। এ নিয়ে তাদের সঙ্গে আমাদের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। আমি পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দেই, বিনা রক্তপাতে বাংলাদেশ সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হবে এবং এ সরকারের সদস্যরা ক্ষমতা গ্রহণের জন্য শিগগিরই ঢাকায় এসে পৌঁছাবেন।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির যাতে কোনো অবনতি না ঘটে বা কোনো ধরনের প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা যাতে নেয়া না হয়, মুক্তিবাহিনীকে আমি তা নিশ্চিত করতে বলি। যুদ্ধবিরতি কার্যকর এবং পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করতে সম্মত হওয়ায় জেনেভা কনভেনশনের প্রতি সম্মান দেখাতেই হবে। তারা শে¬াগান দিতে থাকে এবং হুমকি দেয় যে, তারা কোরো তোয়াক্কা করে না এবং তারা তাদের ইচ্ছেমতো কাজ করবে। আমি তাদেরকে তখন বললাম, জেনেভা কনভেনশনের ধারা যাতে যথাযথভাবে অনুসৃত হয় আমরা তা নিশ্চিত করবো। বিদেশী সাংবাদিকরা বিকৃত করে রিপোর্ট করেন যে, আমি নাকি তাদেরকে গুলি করার হুমকি দিয়েছি। তারপরও তারা আমাদেরকে যেতে দেয় এবং দুপুর ১টায় আমরা হেডকোয়ার্টার্সে পৌঁছাই।
জেনারেল নিয়াজি তার অফিসে আমাকে স্বাগত জানান। আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী, মেজর জেনারেল জামশেদ, নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল শরিফ, বিমান বাহিনীর এয়ার কমোডর ইনাম ও ব্রিগেডিয়ার বাকির সিদ্দিকী। মেজর জেনারেল জিসি নাগরা কিছুক্ষণ আগে এসে পৌঁছান। সাদা পতাকাসহ নাগরা ও তার পথ প্রদর্শককে নিয়াজির নির্দেশে পাকিস্তানি আউট পোস্টে অভ্যর্থনা জানানো হয় এবং পাকিস্তানিরা তাকে নিয়াজির হেডকোয়ার্টার্সে নিয়ে আসে। নাগরা ও নিয়াজি পাঞ্জাবী ভাষায় আদি রসাত্মক ঠাট্টা তামাশায় মেতে উঠেন। তাদের কৌতুকগুলো ছাপার অযোগ্য হওয়ায় উলে¬খ করা গেল না। আমি নিয়াজিকে বললাম, টঙ্গীসহ বিভিন্ন এলাকায় এখনো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলছে। তার উচিত লড়াই বন্ধে সংশি¬ষ্ট বাহিনীর প্রতি অর্ডার ইস্যু করা। নিয়াজি যখন অর্ডার ইস্যু করছিলেন তখন নাগরাকে বাইরে ডেকে এনে আমি তার কাজ চালিয়ে যেতে নির্দেশ দিই। তাকে বললাম, প্রথমত: তাকে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য পর্যাপ্ত সৈন্য ঢাকার অভ্যন্তরে আনতে হবে। তারপর আত্মসমর্পণের ব্যবস্থা করতে হবে। আরো বললাম, আমি মনে করি এতদিন যারা নির্যাতিত নিপীড়িত হয়েছে সেই জনগণের সামনে প্রকাশ্যে এ আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত। অতীতে অন্যান্য আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠিত হয়েছে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি গ্রহণের পর। কিন্তু এক্ষেত্রে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল। সেই সঙ্গে আছে প্রয়োজনীয় সংস্থানের অভাব এবং হাতে আর মাত্র দু’তিন ঘন্টা সময়। তার মধ্যে আত্মসমর্পণ সংক্রান্ত আলোচনা সেরে মূল অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে হবে। নিকটবর্তী এলাকা থেকে তখনো গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। আমাদের প্যারাশূট রেজিমেন্ট ও একটি পাকিস্তানি ইউনিটকে দিয়ে নাগরাকে আমি গার্ড অব অনারের আয়োজন করতে বলি। দলিলে সই করার জন্য তাকে একটি টেবিল ও দু’টি চেয়ারের ব্যবস্থা করতে হয়। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের নিরাপত্তার ব্যবস্থাও তাকেই করতে হয়। সেখানে অবস্থান করছিলেন জাতিসংঘ ও রেডক্রস প্রতিনিধিদল, পূর্ব পাকিস্তান সরকারের সদস্যবৃন্দ এবং বিদেশী নাগরিক। ছোট একটি দল ও রেডিও ডিটাচমেন্ট আমার জন্য রেখে যেতে বলি। কারণ আর্মি কমান্ডারকে অভ্যর্থনা জানাতে আমাকে আবার বিমান বন্দরে যেতে হবে। আর্মি কমান্ডারের নিরাপত্তার জন্য বিমান বন্দরে একটি দল পাঠানোর নির্দেশও তাকে দিই।
আমি নিয়াজির অফিসে ফিরে এলে কর্নেল খারা আত্মসমর্পণের শর্তাবলী পাঠ করে শোনান। নিয়াজির চোখ থেকে দরদর করে পানি পড়তে থাকে। সেই সঙ্গে ঘরে নেমে আসে পিনপতন নিস্তব্ধতা। উপস্থিত অন্যান্যদের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দেয়। তাদের আশা ছিল ১৪ ডিসেম্বর স্পিভ্যাককে দেয়া তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী এ দলিল প্রণীত হবে। যাতে জাতিসংঘ প্রস্তাব অনুযায়ী যুদ্ধবিরতি ও প্রত্যাবর্তন কার্যকর করা হবে। ফরমান আলী ভারতীয় ও বাংলাদেশী বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানান। নিয়াজি বললেন, আমি তাকে যে দলিলে সই করতে বলছি তা নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দলিল। 
আমরা যখন এ দলিল প্রণয়ন করি তখন বিশেষভাবে লক্ষ্য রেখেছি যাতে তা কোনোভাবেই অপমানজনক মনে না হয়। ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায় যে, অনমনীয় নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ পরবর্তীতে সুফল বয়ে আনেনি। পরাজিত প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা না করা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অতীতে যা কিছুই ঘটুক না কেন, কিছুটা ছাড় তাদেরকে অবশ্যই দেয়া উচিত। রেডিওতে যা বলেছিলাম বা তার সঙ্গে আমার ফোনে যে কথা হয়েছিল, তার সূত্র ধরে আবার তাকে স্মরণ করিয়ে দেই যে, সৈনিকের প্রাপ্য সম্মান তারা পাবেন এবং জেনেভা কনভেনশন কঠোরভাবে পালন করা হবে। এছাড়াও আমরা সংখ্যালঘু জাতিসত্তাগুলোর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিচ্ছি। এ ধরনের নিশ্চয়তা ও ধারা ইতিহাসের অন্য কোনো আত্মসমর্পণের দলিলে নেই। অন্যদের পাঠ করার জন্য নিয়াজি দলিলটি এগিয়ে দেন। তারা তাতে কিছু পরিবর্তন দাবি করেন। আমি আবারো বললাম, দলিলের শর্তাবলী যথেষ্ট উদার। তারপরও তাদেরকে আলোচনার সুযোগ দিয়ে আমি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে পাকিস্তানি সেন্ট্রির সঙ্গে গল্প গুজব শুরু করি। তার বাড়ি, পরিবার ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রশ্ন করলে প্রথমে তাকে খানিকটা বিভ্রান্ত বলে মনে হলো। তারপর সেও কান্নায় ভেঙে পড়ে। সে যা বললো তার মর্মার্থ এই, একজন ভারতীয় আর্মি জেনারেল তার ভালোমন্দের খোঁজ খবর নিচ্ছেন। অথচ এ নিয়ে তার নিজের অফিসারদের কোনো মাথাব্যথা নেই। আমি অফিসে ফিরে এলে নিয়াজি বললেন, যারা তখন পর্যন্ত প্রতিরোধ করে যাচ্ছিল তাদের কাছেও যুদ্ধবিরতির নির্দেশ পৌঁছে গেছে এবং কোথাও আর কোনো লড়াই নেই। আমি জিজ্ঞেস করলাম, দলিলটি গ্রহণযোগ্য হয়েছে কিনা। কোনো মন্তব্য না করে তিনি কাগজটা আমাকে ফেরত দেন। দলিল ফেরত দেয়াকে আমি তার সম্মতি হিসাবে ধরে নিই। এরপর আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়া নিয়ে নিয়াজির সঙ্গে আমরা আলোচনা করি। তিনি চান যে, আত্মসমর্পণ তার অফিসেই অনুষ্ঠিত হোক। রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আমাদের পরিকল্পনা তাকে জানাই। ‘এটা ঠিক নয়’, বলে তিনি প্রতিবাদ করেন। আমি তাকে বললাম, ভারতীয় ও পাকিস্তানি ডিটাচমেন্ট লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরাকে গার্ড অব অনার দেবে। তারপর অরোরা ও নিয়াজি দলিলে স্বাক্ষর করবেন। সবশেষে নিয়াজি তার তরবারি সমর্পণ করবেন। নিয়াজি জানালেন, তার কোনো তরবারি নেই। আমি বললাম, সে ক্ষেত্রে তিনি তার পিস্তল সমর্পণ করবেন। মনে হলো তিনি খুব অসন্তুষ্ট হয়েছেন। তা সত্ত্বেও তিনি নীরব রইলেন। তাও আমি তার সম্মতি হিসাবে ধরে নিলাম। প্রকাশ্য জনসমক্ষে আত্মসমর্পণের আয়োজন এবং সম্মিলিত গার্ড অব অনার ও সাদামাটা টেবিল নিয়ে কিছুটা সমালোচনা হয়। অথচ আমাকে কোনো দিকনির্দেশনা দেয়া হয়নি। আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা এবং প্রটোকল বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সময় বা সংস্থানও আমি পাইনি। যদিও এরই মধ্যে সবকিছুর ব্যবস্থা করা ছাড়াও পাকিস্তানিদের অবিলম্বে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের শর্তাবলী নিয়ে আলোচনা আমার নিজের উদ্যোগেই করতে হয়। আনুমানিক তিন ঘন্টা সময়ের মধ্যে আত্মসমর্পণের শর্তাবলী চূড়ান্ত করে উপযুক্ত একটি অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে হয়। আমাদের বাহিনী তখনো ঢাকায় প্রবেশ করেনি এবং রাজধানী ও তার আশপাশের এলাকায় টুকটাক সংঘর্ষ তখনো চলছিল। অতীতের দিকে চোখ ফেরালে এখন মনে হয় তখনকার পরিস্থিতি কতই না নাজুক ছিল! যে কোনো মুহূর্তে যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারতো। এরপরে নিয়াজি জিজ্ঞেস করলেন, তার অফিসার ও সৈন্যরা তাদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র সঙ্গে রাখতে পারবে কিনা। তার আগে টেলিফোনে কথা বলার সময়ও একই প্রশ্ন তিনি করেছিলেন। তখন আমি আভাস দিয়েছিলাম, এ অনুরোধ আমরা বিবেচনা করে দেখবো। মুক্তিবাহিনীর ব্যাপারে নিয়াজি সন্ত্রস্ত থাকায় তিনি জানতে চান, আত্মসমর্পণের পর তার লোকজনের নিরাপত্তার কী ব্যবস্থা হবে। আমি এই বলে তাকে আশ্বস্ত করি যে, আমাদের সৈন্যরা শহরে ঢুকতে শুরু করেছে এবং ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত শক্তি তারা সঞ্চয় করতে পারবে। আবার তিনি জানতে চাইলেন, মুক্তিবাহিনীর হাতে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র থাকায় পর্যাপ্ত ভারতীয় সৈন্য এসে না পৌঁছানো পর্যন্ত পাকিস্তানিরা নিজেদের কাছে অস্ত্র রাখতে পারবে কিনা। উত্তরে আমি বললাম, আমরা নিরস্ত্র না করা পর্যন্ত তারা নিজেদের কাছে অস্ত্র রাখতে পারবে এবং এ নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ায় আমাদের ৩/৪ দিন পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। আত্মসমর্পণের অব্যবহিত পরে পাকিস্তানিদেরকে নিরস্ত্র না করার সিদ্ধান্ত নেয়ায় আমার সমালোচনা করা হয়। কিন্তু ঢাকায় আমাদের পর্যাপ্ত সৈন্য এসে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত তা না করে আমার উপায় ছিল না। আমি শুধু আশা করছিলাম, পাকিস্তানিদেরকে যে খসড়াটি আমি দেখিয়েছিলাম, অরোরা যেন স্বাক্ষরের জন্য তার সঙ্গে তাই নিয়ে আসেন। এ তথ্যটি রেডিও মারফত জানানোর জন্য আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম। কিন্তু নাগরা তার সঙ্গে করে এসকর্ট ও রেডিও ডিটাচমেন্ট নিয়ে চলে যান। কিছুই রেখে যাননি। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি রেডিও মারফত ইস্টার্ন কমান্ডকে আমি জানাই যে, আত্মসমর্পণের সমস্ত ব্যবস্থা সম্পন্ন হয়েছে। আমি তাদেরকে বলি যে, আর্মি কমান্ডারের ঢাকায় পৌঁছানোর আনুমানিক সময় যেন আমাকে জানানো হয়। এর কোনো উত্তর আমি পাইনি। ঢাকায় অবতরণের পরিবর্তে আর্মি কমান্ডার আগরতলা যান চতুর্থ কোর কমান্ডার এবং সেই কোরের ডিভিশনাল কমান্ডারদেরকে তার সঙ্গী হিসাবে নিতে আসতে।
হেডকোয়ার্টার্সের বাইরে অস্থিরভাবে আমি পায়চারি করছিলাম। এর মধ্যে আমার অজান্তে বিবিসির অ্যালান হার্ট আমার ছবি নিতে শুরু করেন। কয়েক মিনিট ধরে এক সঙ্গে আমরা উঠানামা করি। তার সঙ্গে যে মাইক্রোফোন থাকতে পারে তা আমার মাথায় একেবারেই আসেনি। সৌভাগ্যবশত আমি তেমন কোনো মন্তব্য করিনি। অফিসে ফিরে এলে নিয়াজি আমাকে তার সঙ্গে লাঞ্চের আমন্ত্রণ জানালে আমরা একসঙ্গে মেসের দিকে রওনা দিই। অবজারভারের গ্যাভিন ইয়াং বললেন, তারও খুব ক্ষুধা পেয়েছে। জানতে চাইলেন, আমাদের সঙ্গে তিনি লাঞ্চ করতে পারবেন কিনা। আমি তাকে সঙ্গে নিয়ে নিলাম। আমার খেতে ইচ্ছে করছিল না। মেসের চিরাচরিত খাবার। মুরগির রোস্ট দিয়ে মেইন কোর্স। গ্যাভিন ইয়াং একটা স্কুপ পেয়ে গেলেন। অবজারভারের দু’পৃষ্ঠা জুড়ে খবরের শিরোনাম হলো, ‘দ্য সারেন্ডার লাঞ্চ।’ 
পুরো দৃশ্যটাই আমার কাছে অবাস্তব বলে মনে হচ্ছিল। মেসের ডিসপে¬তে রুপা। পাকিস্তানি অফিসাররা খাচ্ছে আর নিজেদের মধ্যে খোশগল্প করছে। যেন স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মেসে একটা অনুষ্ঠান। কর্নেল খারা ও আমি একাকোণে দাঁড়ানো। তাদের সঙ্গে ভাইয়ের মতো মিশে যাওয়া বা খাওয়ার কোনো ইচ্ছে ছিল না আমাদের। লাঞ্চের পর অরোরার ঢাকায় পৌঁছানোর আনুমানিক সময় জানতে চেয়ে কলকাতায় আবার একটা রেডিও মেসেজ পাঠাই। তাদের কাছ থেকে কোনো খবর পাওয়া গেল না। বিকেল ৩ টায় নিয়াজিকে আমি আমাদের সঙ্গে বিমান বন্দরে যেতে বলি। সামনে পাইলট জীপ নিয়ে আমরা তার গাড়িতে করে বিমান বন্দরে যাই। এখান থেকেই সমস্যার সূত্রপাত হয়। মুক্তিবাহিনী আমাদেরকে বিমান বন্দরে যেতে বাধা দেয়। তাদের কেউ কেউ গাড়ির বনেটের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছিল। আমাদের সৌভাগ্য যে, শিখ কর্নেল খারা আমাদের সঙ্গে ছিলেন। তিনি তার পাগড়িসহ মাথা গাড়ি থেকে বের করে বললেন, নিয়াজি ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি এবং আমাদেরকে বাধা দেয়া তাদের উচিত হচ্ছে না। চতুর্দিক থেকে হাল্কা অস্ত্রের বিচ্ছিন্ন গোলাগুলির শব্দ তখনো শোনা যাচ্ছিল। অনেক ঝামেলার মধ্য দিয়ে আমরা বিমান বন্দরে পৌঁছাই। পৌঁছানোর অব্যবহিত আগে রাস্তা হারিয়ে ফেলা দুই ভারতীয় ছত্রী সেনাসহ একটি জীপ থামিয়ে তাদেরকে আমাদের সঙ্গে আসতে বলি। এটা ছিল সৌভাগ্যের ছোঁয়া। বিমান বন্দরে নিয়াজির নিরাপত্তা নিয়ে আমি খুব উদ্বিগ্ন ছিলাম। পাইলট জীপে পাকিস্তানি মিলিটারি পুলিশের হাতে রিভলবার। দু’জন ছত্রী সেনার হাতের রাইফেল ছাড়া দৃষ্টিসীমার মধ্যে কোনো ভারতীয় সৈন্যের দেখা নেই। কর্নেল খারাকে বললাম, মেজর জেনারেল নাগরা কাউকে না পাঠানোয় তার উচিত হবে কিছু ভারতীয় সৈন্য সম্ভব হলে কয়েকটি ট্যাংক সংগ্রহ করা। আমরা জানতাম চতুর্থ কোর ১৫ ডিসেম্বর রাতে অল্প কয়েকটি ট্যাংক মেঘনা নদী পার করানোর চেষ্টা করছিল। উপায় বের করার জন্য খারা বেরিয়ে যান। তার সামান্য পরে একটি ট্রাক বোঝাই মুক্তিবাহিনী রানওয়ের অন্য পাশে এসে থামে। মুক্তিবাহিনীর দু’জন সৈন্যের পেছনে কাঁধে মেজর জেনারেল র‌্যাঙ্কের ব্যাজ লাগিয়ে একজন লোক আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন। এই লোকটি ছিল বাঘা সিদ্দিকী। তাকে আমি আমার শোনা বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে চিনতে পারি। বিপদের গন্ধ পেয়ে আমি নিয়াজিকে আড়াল করার জন্য দু’জন ছত্রী সেনাকে নির্দেশ দিয়ে সিদ্দিকীর দিকে এগিয়ে যাই। আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করার জন্য নিয়াজিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আমি আশংকা করছিলাম কাদের সিদ্দিকী হয়ত তাকে গুলি করতে এসেছেন। ভদ্রভাবে আমি তাকে বিমান বন্দর ত্যাগ করতে বললাম। কিন্তু তার মধ্যে নড়াচড়ার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। তারপর আমি নির্দেশের সুরে তার সঙ্গে কথা বলি। তখনো তিনি ইতস্তত করছিলেন। তারপর সিদ্দিকী রুষ্টভাবে রানওয়ে অতিক্রম করে ট্রাকের দিকে রওনা দেন। চিৎকার করে আমি তাকে বিমান বন্দর থেকে ট্রাক সরিয়ে নিতে বলি। ট্রাকটি শেষ পর্যন্ত চলে যাওয়ায় আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি। 
এর সামান্য পরে একটি পিটি-৭৬ ট্যাংক নিয়ে কর্নেল খারা হাজির হন। কথা ছিল ২০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে কাদের সিদ্দিকী আমাদের বাহিনীর সঙ্গে মার্চ করে ঢাকায় আসবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার দেখা পাওয়া যায়নি। পশ্চাদপসরণরত পাকিস্তানিদেরকে টাঙ্গাইলে তিনি ইন্টারসেপ্ট না করে এখন ঢাকার এই বিমান বন্দরে কী উদ্দেশ্যে এসেছেন তা আমার কাছে পরিষ্কার ছিল না। কয়েকদিন পর তিনি বিদেশী সাংবাদিকদেরকে তার ভাষায় বিশ্বাসঘাতকদের জনসমক্ষে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করার দৃশ্য দেখান। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে এসব ছবি ব্যাপক প্রচার লাভ করে।
আনুমানিক বিকাল সাড়ে চারটায় আর্মি কমান্ডার ও তার সফরসঙ্গীরা পাঁচটি এমআই-৪ এবং চারটি অ্যালুয়েট হেলিকপ্টারের একটি বহর নিয়ে ঢাকায় পৌঁছান। নিয়াজি ও আমি তাদেরকে অভ্যর্থনা জানাতে যাই। মিসেস অরোরাকে সঙ্গে নিয়ে আর্মি কমান্ডার নেমে আসেন। আরো অবতরণ করেন এয়ার মার্শাল দেওয়ান, ভাইস অ্যাডমিরাল কৃষ্ণ, লেফটেন্যান্ট জেনারেল সগৎ সিং, চতুর্থ কোরের ডিভিশনাল কমান্ডারগণ ও উইং কমান্ডার একে খন্দকার। ওসমানীকে অবশ্য দেখা গেল না। নিয়াজি, লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরা ও এয়ার মার্শাল দেওয়ান গাড়ির দিকে এগিয়ে যান। আমারও এ গাড়িতেই যাবার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু মিসেস অরোরা তার স্বামীর পাশের আসন দখল করায় সেই আশা আমাকে ছাড়তে হয়। গাড়ি রওনা দিয়ে দিলে আমি অন্য গাড়িতে ঝাঁকুনি খেতে খেতে রেসকোর্স ময়দানের দিকে যাত্রা করি। আয়োজনের জন্য সময় খুব কম থাকা সত্ত্বেও অনুষ্ঠানটি মোটামুটি ভালভাবে সম্পন্ন হয়। গার্ড অব অনার পরিদর্শনের পর অরোরা ও নিয়াজি টেবিলের দিকে এগিয়ে যান। অরোরার নিয়ে আসা আত্মসমর্পণের দলিল টেবিলের উপর রাখা হয়। নিয়াজি দলিলের উপরে কৌতূহলী চোখ বুলিয়ে নিয়ে সই করেন। অরোরাও সই দেন। দলিলের উপরে সতর্ক দৃষ্টি দেয়ার সময় তার শিরোনাম লক্ষ্য করে আমি হতবুদ্ধি হয়ে যাই। সেখানে লেখা ছিল, ‘আত্মসমর্পণের দলিল, ভারতীয় স্থানীয় সময় ১৬৩১ মিনিটে স্বাক্ষর করতে হবে।’ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সময় তখন বিকাল চারটা ৫৫ মিনিট। তারপর নিয়াজি তার কাঁধ থেকে অ্যাপ্যুলেট খুলে ফেলেন এবং ল্যানিয়ার্ডসহ ৩৮ বোরের রিভলবার অরোরার হাতে ন্যস্ত করেন। তার চোখে অশ্র“। সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত জনতা তখন নিয়াজি ও পাকিস্তান বিরোধী শে¬াগান ও গালিগালাজ দিতে থাকে। রেসকোর্সের আশপাশে তেমন কোনো সৈন্য না থাকায় নিয়াজির নিরাপত্তা নিয়ে আমরা শঙ্কিত ছিলাম। আমরা কয়েকজন সিনিয়র অফিসার মিলে তার জন্য একটি বেষ্টনী রচনা করে তাকে পাহারা দিয়ে একটি ভারতীয় জীপের কাছে নিয়ে যাই। পাকিস্তানিদেরকে নিরস্ত্র করা, আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং বন্দিদেরকে ভারতে নিয়ে যাবার ব্যাপারে সগৎ সিংকে আমি ব্রিফ করি। এরপর আগরতলায় যাবার উদ্দেশে আমরা ঢাকা বিমান বন্দরে আসি। আমরা যখন অপেক্ষা করছিলাম তখন পাকিস্তান নৌবাহিনীর রিয়ার অ্যাডমিরাল শরীফ অ্যাডমিরাল কৃষ্ণকে বিদায় জানাতে আসেন। শরীফকে কৃষ্ণ পিস্তল সমর্পণ করতে বললে তিনি হোলস্টার থেকে পিস্তল বের করে তার হাতে তুলে দেন। তারপর আমাদের হেলিকপ্টার আকাশে উড়ে।
মানেকশ কিভাবে আগে থেকে আত্মসমর্পণের সময় হিসাব করে বিকাল চারটা ৩১ মিনিট নির্ধারিত করলেন অনেক ভেবেও আমি তা বুঝতে পারিনি। আমি জানতাম পার্লামেন্ট অধিবেশন চলছে। কোনো কারণে মানেকশ হয়তো প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলেন, বিকাল চারটা ৩১ মিনিটে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠিত হবে। কিভাবে হিসাব করে তিনি এই সময় বের করেছিলেন তা আজো আমার কাছে এক রহস্য। অথচ এই নির্ধারিত সময়ে অরোরা ও তার সঙ্গীরা ঢাকা বিমান বন্দরে অবতরণ করতে পারেননি। ঘটনার সময় লোকসভার অধিবেশনে যোগদানকারী পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় পরে আমাকে জানান, ঢাকায় কী ঘটছে তা নিয়ে সবাই ছিলেন খুবই উদ্বিগ্ন। তার বক্তব্য অনুযায়ী পার্লামেন্টে উপস্থিত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি বারবার বলেছিলেন, আত্মসমর্পণের শর্তাবলী নিয়ে আলোচনার জন্য ঢাকায় গিয়ে জেনারেল জ্যাকব লাঞ্চ করছেন। এটা খুবই দুঃখজনক ব্যাপার যে, এমন অনিশ্চিত অশান্ত এক পরিস্থিতিতে একটি দীর্ঘ ও আয়েসী লাঞ্চের জন্য পরবর্তী প্রজন্ম জেনারেল জ্যাকবকে মনে রাখবে!
দুর্ভাগ্যবশত কর্নেল ওসমানী এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি। তার জন্য পাঠানো হেলিকপ্টার পথে শত্র“র গুলির আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সময়মতো তা মেরামত করে তোলা সম্ভব হয়নি। তার অনুপস্থিতির ভুল ব্যাখা করা হয় এবং পরবর্তীতে তা অনেক সমস্যার জন্ম দেয়।
ফোর্ট উইলিয়ামে ফিরে সেদিনের ঘটনাবলীর রিপোর্ট লেখার জন্য অপারেশন রুমে ঢুকে পড়ি। ভোরবেলায় আমি আমার কোয়ার্টারে ফিরি। আমি সবে ঘরে ঢুকেছি এমন সময় বেল বাজলো। সানডে টাইমসের নিকোলাস টোমালিন দরজায় দাঁড়ানো। এই আত্মসমর্পণের উপরে রিপোর্ট করার জন্য তাকে হেলিকপ্টারে জায়গা দেয়া হয়নি বলে তিনি খুবই বিমর্ষ। আত্মসমর্পণ ও এই অভিযানের স্ট্র্র্যাটেজি সম্পর্কে আমি তাকে সবিস্তার বর্ণনা দিই। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে তার এ রিপোর্ট ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়।
 কয়েকদিন পর নিয়াজির সমর্পিত রিভলবার পরীক্ষা করতে গিয়ে আমি বুঝতে পারি অস্ত্রটি তার নয়। পিস্তলটি সাধারণ সৈন্যের জন্য ইস্যু করা একটি ৩৮ বোরের রিভলবার। ময়লায় ব্যারেল বন্ধ। মনে হলো বেশ কিছুদিন তা পরিষ্কার করা হয়নি। ল্যানিয়ার্ডও নোংরা। ঘর্ষণে কয়েকটি জায়গা ছেঁড়া। এমন পিস্তল কোনো কমান্ডিং জেনারেলের ব্যক্তিগত অস্ত্র হতে পারে না। বরং মনে হলো নিয়াজি তার কোনো মিলিটারি পুলিশের কাছ থেকে নিয়ে তার ব্যক্তিগত অস্ত্র হিসাবে সমর্পণ করেছেন। আমার মনে হলো তার ভাগ্যে যা ঘটেছে তা তার প্রাপ্য ছিল।’  
(লেখাটি ‘২৬৭ দিনের মুক্তিযুদ্ধ’ থেকে নেয়া। বইটি প্রকাশ করেছে আফসার ব্রাদার্স)

ফাইটার জেটের হেলমেট

বর্তমান সময়ে আধুনিক এবং নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ফিচার হচ্ছে জেট ফাইটারের ককপিটে বসা এর পাইলটের হেল...