পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা দখলের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন মেজর জেনারেল জ্যাকব। ভারতীয়দের মতে, গোর্খা ক্যাপ পরিহিত বিশাল গোঁফের অধিকারী পার্সি জেনারেল মানেকশ ও শিখ জেনারেল অরোরার চেয়ে পদমর্যাদায় নিচে অবস্থানকারী ইহুদী মেজর জেনারেল ফ্রেডারিক রালফ জ্যাকবই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নিষ্পত্তিকারী ভূমিকা পালন করেন।
১৯৭১ সালে মুক্তিয্ুেদ্ধ মেজর জেনারেল জ্যাকব সীমান্তের ওপার থেকে ভারতীয় সৈন্যদের বাংলাদেশের গভীর অভ্যন্তরে পৌঁছতে নেতৃত্ব দানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণ করে জেনারেল জ্যাকব উপলব্ধি করতে সক্ষম হন যে, যুদ্ধ অনিবার্য। তার পরিকল্পনা ছিল পাকিস্তানি বাহিনীকে এড়িয়ে সরাসরি পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা দখল। ঊর্ধŸতন ভারতীয় কমান্ডারগণ তার পরিকল্পনার বিরোধিতা করেন। অবশেষে তার পরিকল্পনা গৃহীত হয়। পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণে তিনি বিরাট অবদান রেখেছিলেন। তিনি হলেন এ ঐতিহাসিক ঘটনার একজন সাক্ষী ও কুশীলব। তিনি তার নিজের লেখা বই ‘স্যারেন্ডার অ্যাট ঢাকা: বার্থ অব অ্যা নেশন’-এ সেদিনকার ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তার বইয়ের বাংলা অনুবাদ অনুসরণে নিচে তা তুলে ধরা হলো।
‘১৪ ডিসেম্বর আনুমানিক বিকেল পাঁচটায় কলকাতাস্থ মার্কিন কন্স্যুলার অফিসের কূটনীতিক স্পিভ্যাকের সঙ্গে নিয়াজির ভাষায় যুদ্ধবিরতি অথবা আত্মসমর্পণের প্রস্তাবনা নিয়ে তার আলোচনার কথা আমাকে জানান। সঙ্গে সঙ্গে আমি কলকাতাস্থ যুক্তরাষ্ট্রের কন্সাল জেনারেল হার্বার্ট গর্ডনের কাছে ফোন করি। তিনি এ বিষয়ে তার অবগতির কথা অস্বীকার করেন। আমি তাকে আবার একটু পরীক্ষা করে দেখার কথা বলতেই তিনি বললেন, ‘জেক, সত্যি বলছি, নিয়াজির অনুরোধ সম্পর্কে আমি আসলে কিছুই জানি না।’ তারপরও আমি জেনারেল মানেকশকে ফোন করে তাকে দিলি¬স্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করি। তথ্যটি সঠিক কিনা সে বিষয়ে মানেকশ আমাকে প্রশ্ন করলে আমি তাকে জানাই যে, একজন দায়িত্বশীল পদস্থ কর্মকর্তা আমাকে ফোনে একথা জানিয়েছেন এবং আমি তাকে বিশ্বাস করি। আমি নিয়াজির সঙ্গে আবার যোগাযোগের চেষ্টা করবো বলে তাকে জানাই। জেনারেল মানেকশ মার্কিন রাষ্ট্র্রদূতের সঙ্গে কথা বলেন এবং জানান, জেনারেল নিয়াজি স্পিভ্যাকের কাছে কোনো অনুরোধ করেছেন কিনা মার্কিন রাষ্ট্রদূত তার কিছুই জানেন না। আপাতদৃষ্টে মনে হলো স্পিভ্যাক বার্তাটি ইসলামাবাদে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কাছে পাঠিয়েছেন এবং ইসলামাবাদস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত পরবর্তীতে তা ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে পাঠিয়ে দিয়েছেন। পরে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার স্বীকার করেন যে, পররাষ্ট্র দপ্তরে নিয়াজির বার্তাটি একদিন ধরে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যাতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার আগে পাকিস্তানিরা পশ্চিমে আরো কিছু এলাকার দখল নিতে পারে।
জেনারেল মানেকশ বার্তাটি পান ১৫ ডিসেম্বর। তিনি নিশ্চয়তা দেন যে, পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করলে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। এ বিষয়ে পাকিস্তান ইস্টার্ন কমান্ডকে ফোর্ট উইলিয়ামে ইস্টার্ন কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। পাকিস্তানি কমান্ডার-ইন-চীফ এই শর্ত গ্রহণ করার জন্য নিয়াজিকে সংকেত দেন। ১৫ ডিসেম্বর বিকাল পাঁচটা থেকে পরদিন বেলা ৯ টা পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির জন্য উভয়পক্ষ রাজি হয়। পরবর্তীতে এই মেয়াদ বিকাল তিনটা পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়। ধারণা করা হচ্ছিল প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিলেন। হাসান জহির তার ‘দ্য সেপারেশন অব ইস্ট পাকিস্তান’-এ স্স্পুষ্টভাবে উলে¬খ করেছেন যে, পাকিস্তানিরা ‘আত্মসমর্পণ’ শব্দটি পরিহারের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিল। ঢাকায় আত্মসমর্পণ নিয়ে আলোচনার সময় নিয়াজি আশা করেছিলেন স্পিভ্যাককে দেয়া তার প্রস্তাব অনুযায়ী দলিল তৈরি করা হবে। সম্ভবত এ কারণেই পরবর্তীতে ঢাকায় আত্মসমর্পণের দলিল দেখার পরও তিনি তা গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন।
১৬ ডিসেম্বর সকাল সোয়া ৯টায় জেনারেল মানেকশ ফোনে আমাকে অবিলম্বে ঢাকায় গিয়ে সেদিন সন্ধ্যার মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের যাবতীয় ব্যবস্থা স¤পন্ন করতে বলেন। আমরা তার আগে আত্মসমর্পণের যে খসড়া দলিল পাঠিয়েছিলাম তা অনুমোদিত হয়েছে কিনা তা জানতে চাইলে প্রশ্নটি তিনি কৌশলে এড়িয়ে যান। আমি তখন জানতে চাইলাম, সুনির্দিষ্টভাবে কোন কোন বিষয়ে কী কাঠামোতে আমি আলোচনা করবো। উত্তরে তিনি আমাকে বেশি ঝামেলা বাধাতে নিষেধ করে বললেন, কী করতে হবে আমি তা ভালোভাবেই বুঝি। তিনি ব্রিগেডিয়ার সেথনাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে পাঠানোর কথা বললেন। আরো বললেন, তার হাতে থাকবে টাইপ করা একটি দলিল। ব্রিগেডিয়ার সেথনা এ দলিল অরোরার হাতে দেবেন। অরোরা সেই দলিল নিয়েই ঢাকা যাবেন।
মানেকশকে জানালাম আমি একটি রেডিও মেসেজ পেয়েছি এবং তাতে নিয়াজি আমাকে লাঞ্চের নিমন্ত্রণ করেছেন। তিনি বললেন, নিমন্ত্রণ গ্রহণ করা উচিত কিনা তাও তিনি আমাকে জানাবেন। অরোরাকে আমি এ বিষয়ে ব্রিফ করে ঢাকায় যাবার প্রস্তুতি গ্রহণ করলাম। গোয়েন্দা বিভাগের কর্নেল খারা ও বিমান বাহিনীর অগ্রবর্তী হেডকোয়ার্টার্সের এয়ার কমোডর পুরুষোত্তমকে আমার সঙ্গে যেতে বললাম। তার আগে আত্মসমর্পণের যে খসড়া দলিল অনুমোদনের জন্য দিলি¬তে পাঠিয়েছিলাম তার একটি কপি আমাদের সঙ্গে নিয়ে নেই।
ব্রিগেডিয়ার সেথনাকে ব্রিফ করে তাকে ভারতীয় ও বিদেশী সাংবাদিকদের জন্য হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা করতে বললাম। তাকে আরো বললাম, ইস্টার্ন কমান্ডের সেনাবাহিনী প্রধান ছাড়াও নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনী প্রধানরা এতে যোগদান করছেন। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী থেকে কর্নেল ওসমানী ও উইং কমান্ডার খন্দকার যেন উপস্থিত থাকেন, তাও নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য আত্মসমর্পণের আলোচনার বিষয়টি সেথনা সমস্ত সেনা স্থাপনাকে জানিয়ে দেন এবং যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে বলেন। হেলিপ্যাডের দিকে যাবার পথে সিঁড়ি দিয়ে নামতেই মিসেস ভান্তি অরোরার সঙ্গে দেখা। তিনি বললেন, ঢাকায় আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠানে আমার সঙ্গে তার দেখা হবে। আমি ভাবলাম তিনি হয়তো আমার সঙ্গে রসিকতা করছেন। আমার অভিব্যক্তিতে বিস্ময় লক্ষ্য করে তিনি বললেন, ‘আমি বসবো আমার কর্তার পাশে।’ আমি দ্রুত অরোরার অফিসে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, সত্যিই তিনি তার স্ত্রীকে এই অনুষ্ঠানে নিয়ে যাচ্ছেন কিনা। জবাবে তিনি বললেন, তিনি মানেকশর অনুমোদন নিয়েছেন। আমি বললাম, ঢাকায় এখনো লড়াই চলছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। এই অবস্থায় কোনো মহিলাকে সেখানে নিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। বাঁকা সুরে তিনি উত্তর দিলেন, ঢাকায় তার নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব আমার। আমি বুঝে গেলাম, এ নিয়ে তর্ক করা বৃথা। আমি নিজের কাজে চলে গেলাম।
যশোরে আমরা হেলিকপ্টার পরিবর্তন করতে নামলে আর্মি হেডকোয়ার্টার্স থেকে পাঠানো একটি বার্তা আমাকে দেয়া হয়। তাতে বলা হয়েছে, সরকার আমাকে নিয়াজির লাঞ্চের নিমন্ত্রণ গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছে। আত্মসমর্পণের দলিলের খসড়ার অনুমোদন সম্পর্কিত কোনো বার্তা তখনো আমি পাইনি। দূর থেকে গোলাবর্ষণের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। ঢাকা বিমান বন্দরের প্রবেশ মুখে এসে আমরা একটি হেলিকপ্টারকে বিদায় নিতে দেখি। টারমাকে ১৮ জন পাকিস্তানি সৈন্য লাইন দিয়ে দাঁড়ানো। বিমান বিধ্বংসী কামান আমাদের হেলিকপ্টারের দিকে তাক করা। তাও আমরা লক্ষ্য করি। এয়ার কমোডর ফিরে যেতে চাইলেও পাইলটকে আমি ল্যান্ড করার নির্দেশ দিই। পাকিস্তান ইস্টার্ন কমান্ডের চীফ অব স্টাফ ব্রিগেডিয়ার বাকির সিদ্দিকী আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ঢাকাস্থ জাতিসংঘ প্রতিনিধিও সেখানে উপস্থিত। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে আলোচনায় তার অফিস ব্যবহারের জন্য তিনি প্রস্তাব দেন। কিন্তু আমি চাইনি জাতিসংঘ এতে কোনোভাবে জড়িত হোক। কেননা আমি মনে করতাম সমস্যায় তাদের কিছু করণীয় নেই। এয়ার কমোডর পুরুষোত্তমকে আমি পাকিস্তান এয়ার ফোর্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে অরোরা ও তার সফর সঙ্গীদের নিরাপদ অবতরণ নিশ্চিত করতে বললাম। টারমাকের উপরে ১৮টি বিমান সম্পর্কে আমি তাকে ঠাট্টা করি। এ বিমানগুলো ভূপাতিত অথবা ধ্বংস হওয়ার খবর আমরা শুনেছিলাম। ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিকী, কর্নেল এমএস খারা ও আমি গাড়িতে করে নিয়াজির হেডকোয়ার্টার্সে যাই। পথে মুক্তিবাহিনী আমাদেরকে থামায়। তারা ছিল খুবই জঙ্গি মেজাজে এবং যে কোনো রকমের ভাংচুর শুরু করার জন্য তৈরি ছিল। তাদের সঙ্গে ছিলেন বিদেশী সংবাদ সংস্থার কয়েকজন প্রতিনিধি। আমি তাদের বুঝানোর চেষ্টা করি যে, যুদ্ধ শেষ এবং রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করবে। এতে তারা উত্তেজিত হয়ে চেঁচামেচি শুরু করে এবং পাকিস্তানি কমান্ড হেডকোয়ার্টার্স দখল করে নিয়াজি ও তার অনুচরদের পাওনা কড়ায় গণ্ডায় বুঝিয়ে দিতে চায়। এ নিয়ে তাদের সঙ্গে আমাদের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। আমি পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দেই, বিনা রক্তপাতে বাংলাদেশ সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হবে এবং এ সরকারের সদস্যরা ক্ষমতা গ্রহণের জন্য শিগগিরই ঢাকায় এসে পৌঁছাবেন।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির যাতে কোনো অবনতি না ঘটে বা কোনো ধরনের প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা যাতে নেয়া না হয়, মুক্তিবাহিনীকে আমি তা নিশ্চিত করতে বলি। যুদ্ধবিরতি কার্যকর এবং পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করতে সম্মত হওয়ায় জেনেভা কনভেনশনের প্রতি সম্মান দেখাতেই হবে। তারা শে¬াগান দিতে থাকে এবং হুমকি দেয় যে, তারা কোরো তোয়াক্কা করে না এবং তারা তাদের ইচ্ছেমতো কাজ করবে। আমি তাদেরকে তখন বললাম, জেনেভা কনভেনশনের ধারা যাতে যথাযথভাবে অনুসৃত হয় আমরা তা নিশ্চিত করবো। বিদেশী সাংবাদিকরা বিকৃত করে রিপোর্ট করেন যে, আমি নাকি তাদেরকে গুলি করার হুমকি দিয়েছি। তারপরও তারা আমাদেরকে যেতে দেয় এবং দুপুর ১টায় আমরা হেডকোয়ার্টার্সে পৌঁছাই।
জেনারেল নিয়াজি তার অফিসে আমাকে স্বাগত জানান। আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী, মেজর জেনারেল জামশেদ, নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল শরিফ, বিমান বাহিনীর এয়ার কমোডর ইনাম ও ব্রিগেডিয়ার বাকির সিদ্দিকী। মেজর জেনারেল জিসি নাগরা কিছুক্ষণ আগে এসে পৌঁছান। সাদা পতাকাসহ নাগরা ও তার পথ প্রদর্শককে নিয়াজির নির্দেশে পাকিস্তানি আউট পোস্টে অভ্যর্থনা জানানো হয় এবং পাকিস্তানিরা তাকে নিয়াজির হেডকোয়ার্টার্সে নিয়ে আসে। নাগরা ও নিয়াজি পাঞ্জাবী ভাষায় আদি রসাত্মক ঠাট্টা তামাশায় মেতে উঠেন। তাদের কৌতুকগুলো ছাপার অযোগ্য হওয়ায় উলে¬খ করা গেল না। আমি নিয়াজিকে বললাম, টঙ্গীসহ বিভিন্ন এলাকায় এখনো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলছে। তার উচিত লড়াই বন্ধে সংশি¬ষ্ট বাহিনীর প্রতি অর্ডার ইস্যু করা। নিয়াজি যখন অর্ডার ইস্যু করছিলেন তখন নাগরাকে বাইরে ডেকে এনে আমি তার কাজ চালিয়ে যেতে নির্দেশ দিই। তাকে বললাম, প্রথমত: তাকে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য পর্যাপ্ত সৈন্য ঢাকার অভ্যন্তরে আনতে হবে। তারপর আত্মসমর্পণের ব্যবস্থা করতে হবে। আরো বললাম, আমি মনে করি এতদিন যারা নির্যাতিত নিপীড়িত হয়েছে সেই জনগণের সামনে প্রকাশ্যে এ আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত। অতীতে অন্যান্য আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠিত হয়েছে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি গ্রহণের পর। কিন্তু এক্ষেত্রে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল। সেই সঙ্গে আছে প্রয়োজনীয় সংস্থানের অভাব এবং হাতে আর মাত্র দু’তিন ঘন্টা সময়। তার মধ্যে আত্মসমর্পণ সংক্রান্ত আলোচনা সেরে মূল অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে হবে। নিকটবর্তী এলাকা থেকে তখনো গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। আমাদের প্যারাশূট রেজিমেন্ট ও একটি পাকিস্তানি ইউনিটকে দিয়ে নাগরাকে আমি গার্ড অব অনারের আয়োজন করতে বলি। দলিলে সই করার জন্য তাকে একটি টেবিল ও দু’টি চেয়ারের ব্যবস্থা করতে হয়। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের নিরাপত্তার ব্যবস্থাও তাকেই করতে হয়। সেখানে অবস্থান করছিলেন জাতিসংঘ ও রেডক্রস প্রতিনিধিদল, পূর্ব পাকিস্তান সরকারের সদস্যবৃন্দ এবং বিদেশী নাগরিক। ছোট একটি দল ও রেডিও ডিটাচমেন্ট আমার জন্য রেখে যেতে বলি। কারণ আর্মি কমান্ডারকে অভ্যর্থনা জানাতে আমাকে আবার বিমান বন্দরে যেতে হবে। আর্মি কমান্ডারের নিরাপত্তার জন্য বিমান বন্দরে একটি দল পাঠানোর নির্দেশও তাকে দিই।
আমি নিয়াজির অফিসে ফিরে এলে কর্নেল খারা আত্মসমর্পণের শর্তাবলী পাঠ করে শোনান। নিয়াজির চোখ থেকে দরদর করে পানি পড়তে থাকে। সেই সঙ্গে ঘরে নেমে আসে পিনপতন নিস্তব্ধতা। উপস্থিত অন্যান্যদের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দেয়। তাদের আশা ছিল ১৪ ডিসেম্বর স্পিভ্যাককে দেয়া তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী এ দলিল প্রণীত হবে। যাতে জাতিসংঘ প্রস্তাব অনুযায়ী যুদ্ধবিরতি ও প্রত্যাবর্তন কার্যকর করা হবে। ফরমান আলী ভারতীয় ও বাংলাদেশী বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানান। নিয়াজি বললেন, আমি তাকে যে দলিলে সই করতে বলছি তা নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দলিল।
আমরা যখন এ দলিল প্রণয়ন করি তখন বিশেষভাবে লক্ষ্য রেখেছি যাতে তা কোনোভাবেই অপমানজনক মনে না হয়। ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায় যে, অনমনীয় নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ পরবর্তীতে সুফল বয়ে আনেনি। পরাজিত প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা না করা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অতীতে যা কিছুই ঘটুক না কেন, কিছুটা ছাড় তাদেরকে অবশ্যই দেয়া উচিত। রেডিওতে যা বলেছিলাম বা তার সঙ্গে আমার ফোনে যে কথা হয়েছিল, তার সূত্র ধরে আবার তাকে স্মরণ করিয়ে দেই যে, সৈনিকের প্রাপ্য সম্মান তারা পাবেন এবং জেনেভা কনভেনশন কঠোরভাবে পালন করা হবে। এছাড়াও আমরা সংখ্যালঘু জাতিসত্তাগুলোর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিচ্ছি। এ ধরনের নিশ্চয়তা ও ধারা ইতিহাসের অন্য কোনো আত্মসমর্পণের দলিলে নেই। অন্যদের পাঠ করার জন্য নিয়াজি দলিলটি এগিয়ে দেন। তারা তাতে কিছু পরিবর্তন দাবি করেন। আমি আবারো বললাম, দলিলের শর্তাবলী যথেষ্ট উদার। তারপরও তাদেরকে আলোচনার সুযোগ দিয়ে আমি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে পাকিস্তানি সেন্ট্রির সঙ্গে গল্প গুজব শুরু করি। তার বাড়ি, পরিবার ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রশ্ন করলে প্রথমে তাকে খানিকটা বিভ্রান্ত বলে মনে হলো। তারপর সেও কান্নায় ভেঙে পড়ে। সে যা বললো তার মর্মার্থ এই, একজন ভারতীয় আর্মি জেনারেল তার ভালোমন্দের খোঁজ খবর নিচ্ছেন। অথচ এ নিয়ে তার নিজের অফিসারদের কোনো মাথাব্যথা নেই। আমি অফিসে ফিরে এলে নিয়াজি বললেন, যারা তখন পর্যন্ত প্রতিরোধ করে যাচ্ছিল তাদের কাছেও যুদ্ধবিরতির নির্দেশ পৌঁছে গেছে এবং কোথাও আর কোনো লড়াই নেই। আমি জিজ্ঞেস করলাম, দলিলটি গ্রহণযোগ্য হয়েছে কিনা। কোনো মন্তব্য না করে তিনি কাগজটা আমাকে ফেরত দেন। দলিল ফেরত দেয়াকে আমি তার সম্মতি হিসাবে ধরে নিই। এরপর আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়া নিয়ে নিয়াজির সঙ্গে আমরা আলোচনা করি। তিনি চান যে, আত্মসমর্পণ তার অফিসেই অনুষ্ঠিত হোক। রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আমাদের পরিকল্পনা তাকে জানাই। ‘এটা ঠিক নয়’, বলে তিনি প্রতিবাদ করেন। আমি তাকে বললাম, ভারতীয় ও পাকিস্তানি ডিটাচমেন্ট লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরাকে গার্ড অব অনার দেবে। তারপর অরোরা ও নিয়াজি দলিলে স্বাক্ষর করবেন। সবশেষে নিয়াজি তার তরবারি সমর্পণ করবেন। নিয়াজি জানালেন, তার কোনো তরবারি নেই। আমি বললাম, সে ক্ষেত্রে তিনি তার পিস্তল সমর্পণ করবেন। মনে হলো তিনি খুব অসন্তুষ্ট হয়েছেন। তা সত্ত্বেও তিনি নীরব রইলেন। তাও আমি তার সম্মতি হিসাবে ধরে নিলাম। প্রকাশ্য জনসমক্ষে আত্মসমর্পণের আয়োজন এবং সম্মিলিত গার্ড অব অনার ও সাদামাটা টেবিল নিয়ে কিছুটা সমালোচনা হয়। অথচ আমাকে কোনো দিকনির্দেশনা দেয়া হয়নি। আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা এবং প্রটোকল বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সময় বা সংস্থানও আমি পাইনি। যদিও এরই মধ্যে সবকিছুর ব্যবস্থা করা ছাড়াও পাকিস্তানিদের অবিলম্বে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের শর্তাবলী নিয়ে আলোচনা আমার নিজের উদ্যোগেই করতে হয়। আনুমানিক তিন ঘন্টা সময়ের মধ্যে আত্মসমর্পণের শর্তাবলী চূড়ান্ত করে উপযুক্ত একটি অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে হয়। আমাদের বাহিনী তখনো ঢাকায় প্রবেশ করেনি এবং রাজধানী ও তার আশপাশের এলাকায় টুকটাক সংঘর্ষ তখনো চলছিল। অতীতের দিকে চোখ ফেরালে এখন মনে হয় তখনকার পরিস্থিতি কতই না নাজুক ছিল! যে কোনো মুহূর্তে যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারতো। এরপরে নিয়াজি জিজ্ঞেস করলেন, তার অফিসার ও সৈন্যরা তাদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র সঙ্গে রাখতে পারবে কিনা। তার আগে টেলিফোনে কথা বলার সময়ও একই প্রশ্ন তিনি করেছিলেন। তখন আমি আভাস দিয়েছিলাম, এ অনুরোধ আমরা বিবেচনা করে দেখবো। মুক্তিবাহিনীর ব্যাপারে নিয়াজি সন্ত্রস্ত থাকায় তিনি জানতে চান, আত্মসমর্পণের পর তার লোকজনের নিরাপত্তার কী ব্যবস্থা হবে। আমি এই বলে তাকে আশ্বস্ত করি যে, আমাদের সৈন্যরা শহরে ঢুকতে শুরু করেছে এবং ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত শক্তি তারা সঞ্চয় করতে পারবে। আবার তিনি জানতে চাইলেন, মুক্তিবাহিনীর হাতে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র থাকায় পর্যাপ্ত ভারতীয় সৈন্য এসে না পৌঁছানো পর্যন্ত পাকিস্তানিরা নিজেদের কাছে অস্ত্র রাখতে পারবে কিনা। উত্তরে আমি বললাম, আমরা নিরস্ত্র না করা পর্যন্ত তারা নিজেদের কাছে অস্ত্র রাখতে পারবে এবং এ নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ায় আমাদের ৩/৪ দিন পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। আত্মসমর্পণের অব্যবহিত পরে পাকিস্তানিদেরকে নিরস্ত্র না করার সিদ্ধান্ত নেয়ায় আমার সমালোচনা করা হয়। কিন্তু ঢাকায় আমাদের পর্যাপ্ত সৈন্য এসে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত তা না করে আমার উপায় ছিল না। আমি শুধু আশা করছিলাম, পাকিস্তানিদেরকে যে খসড়াটি আমি দেখিয়েছিলাম, অরোরা যেন স্বাক্ষরের জন্য তার সঙ্গে তাই নিয়ে আসেন। এ তথ্যটি রেডিও মারফত জানানোর জন্য আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম। কিন্তু নাগরা তার সঙ্গে করে এসকর্ট ও রেডিও ডিটাচমেন্ট নিয়ে চলে যান। কিছুই রেখে যাননি। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি রেডিও মারফত ইস্টার্ন কমান্ডকে আমি জানাই যে, আত্মসমর্পণের সমস্ত ব্যবস্থা সম্পন্ন হয়েছে। আমি তাদেরকে বলি যে, আর্মি কমান্ডারের ঢাকায় পৌঁছানোর আনুমানিক সময় যেন আমাকে জানানো হয়। এর কোনো উত্তর আমি পাইনি। ঢাকায় অবতরণের পরিবর্তে আর্মি কমান্ডার আগরতলা যান চতুর্থ কোর কমান্ডার এবং সেই কোরের ডিভিশনাল কমান্ডারদেরকে তার সঙ্গী হিসাবে নিতে আসতে।
হেডকোয়ার্টার্সের বাইরে অস্থিরভাবে আমি পায়চারি করছিলাম। এর মধ্যে আমার অজান্তে বিবিসির অ্যালান হার্ট আমার ছবি নিতে শুরু করেন। কয়েক মিনিট ধরে এক সঙ্গে আমরা উঠানামা করি। তার সঙ্গে যে মাইক্রোফোন থাকতে পারে তা আমার মাথায় একেবারেই আসেনি। সৌভাগ্যবশত আমি তেমন কোনো মন্তব্য করিনি। অফিসে ফিরে এলে নিয়াজি আমাকে তার সঙ্গে লাঞ্চের আমন্ত্রণ জানালে আমরা একসঙ্গে মেসের দিকে রওনা দিই। অবজারভারের গ্যাভিন ইয়াং বললেন, তারও খুব ক্ষুধা পেয়েছে। জানতে চাইলেন, আমাদের সঙ্গে তিনি লাঞ্চ করতে পারবেন কিনা। আমি তাকে সঙ্গে নিয়ে নিলাম। আমার খেতে ইচ্ছে করছিল না। মেসের চিরাচরিত খাবার। মুরগির রোস্ট দিয়ে মেইন কোর্স। গ্যাভিন ইয়াং একটা স্কুপ পেয়ে গেলেন। অবজারভারের দু’পৃষ্ঠা জুড়ে খবরের শিরোনাম হলো, ‘দ্য সারেন্ডার লাঞ্চ।’
পুরো দৃশ্যটাই আমার কাছে অবাস্তব বলে মনে হচ্ছিল। মেসের ডিসপে¬তে রুপা। পাকিস্তানি অফিসাররা খাচ্ছে আর নিজেদের মধ্যে খোশগল্প করছে। যেন স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মেসে একটা অনুষ্ঠান। কর্নেল খারা ও আমি একাকোণে দাঁড়ানো। তাদের সঙ্গে ভাইয়ের মতো মিশে যাওয়া বা খাওয়ার কোনো ইচ্ছে ছিল না আমাদের। লাঞ্চের পর অরোরার ঢাকায় পৌঁছানোর আনুমানিক সময় জানতে চেয়ে কলকাতায় আবার একটা রেডিও মেসেজ পাঠাই। তাদের কাছ থেকে কোনো খবর পাওয়া গেল না। বিকেল ৩ টায় নিয়াজিকে আমি আমাদের সঙ্গে বিমান বন্দরে যেতে বলি। সামনে পাইলট জীপ নিয়ে আমরা তার গাড়িতে করে বিমান বন্দরে যাই। এখান থেকেই সমস্যার সূত্রপাত হয়। মুক্তিবাহিনী আমাদেরকে বিমান বন্দরে যেতে বাধা দেয়। তাদের কেউ কেউ গাড়ির বনেটের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছিল। আমাদের সৌভাগ্য যে, শিখ কর্নেল খারা আমাদের সঙ্গে ছিলেন। তিনি তার পাগড়িসহ মাথা গাড়ি থেকে বের করে বললেন, নিয়াজি ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি এবং আমাদেরকে বাধা দেয়া তাদের উচিত হচ্ছে না। চতুর্দিক থেকে হাল্কা অস্ত্রের বিচ্ছিন্ন গোলাগুলির শব্দ তখনো শোনা যাচ্ছিল। অনেক ঝামেলার মধ্য দিয়ে আমরা বিমান বন্দরে পৌঁছাই। পৌঁছানোর অব্যবহিত আগে রাস্তা হারিয়ে ফেলা দুই ভারতীয় ছত্রী সেনাসহ একটি জীপ থামিয়ে তাদেরকে আমাদের সঙ্গে আসতে বলি। এটা ছিল সৌভাগ্যের ছোঁয়া। বিমান বন্দরে নিয়াজির নিরাপত্তা নিয়ে আমি খুব উদ্বিগ্ন ছিলাম। পাইলট জীপে পাকিস্তানি মিলিটারি পুলিশের হাতে রিভলবার। দু’জন ছত্রী সেনার হাতের রাইফেল ছাড়া দৃষ্টিসীমার মধ্যে কোনো ভারতীয় সৈন্যের দেখা নেই। কর্নেল খারাকে বললাম, মেজর জেনারেল নাগরা কাউকে না পাঠানোয় তার উচিত হবে কিছু ভারতীয় সৈন্য সম্ভব হলে কয়েকটি ট্যাংক সংগ্রহ করা। আমরা জানতাম চতুর্থ কোর ১৫ ডিসেম্বর রাতে অল্প কয়েকটি ট্যাংক মেঘনা নদী পার করানোর চেষ্টা করছিল। উপায় বের করার জন্য খারা বেরিয়ে যান। তার সামান্য পরে একটি ট্রাক বোঝাই মুক্তিবাহিনী রানওয়ের অন্য পাশে এসে থামে। মুক্তিবাহিনীর দু’জন সৈন্যের পেছনে কাঁধে মেজর জেনারেল র্যাঙ্কের ব্যাজ লাগিয়ে একজন লোক আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন। এই লোকটি ছিল বাঘা সিদ্দিকী। তাকে আমি আমার শোনা বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে চিনতে পারি। বিপদের গন্ধ পেয়ে আমি নিয়াজিকে আড়াল করার জন্য দু’জন ছত্রী সেনাকে নির্দেশ দিয়ে সিদ্দিকীর দিকে এগিয়ে যাই। আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করার জন্য নিয়াজিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আমি আশংকা করছিলাম কাদের সিদ্দিকী হয়ত তাকে গুলি করতে এসেছেন। ভদ্রভাবে আমি তাকে বিমান বন্দর ত্যাগ করতে বললাম। কিন্তু তার মধ্যে নড়াচড়ার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। তারপর আমি নির্দেশের সুরে তার সঙ্গে কথা বলি। তখনো তিনি ইতস্তত করছিলেন। তারপর সিদ্দিকী রুষ্টভাবে রানওয়ে অতিক্রম করে ট্রাকের দিকে রওনা দেন। চিৎকার করে আমি তাকে বিমান বন্দর থেকে ট্রাক সরিয়ে নিতে বলি। ট্রাকটি শেষ পর্যন্ত চলে যাওয়ায় আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি।
এর সামান্য পরে একটি পিটি-৭৬ ট্যাংক নিয়ে কর্নেল খারা হাজির হন। কথা ছিল ২০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে কাদের সিদ্দিকী আমাদের বাহিনীর সঙ্গে মার্চ করে ঢাকায় আসবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার দেখা পাওয়া যায়নি। পশ্চাদপসরণরত পাকিস্তানিদেরকে টাঙ্গাইলে তিনি ইন্টারসেপ্ট না করে এখন ঢাকার এই বিমান বন্দরে কী উদ্দেশ্যে এসেছেন তা আমার কাছে পরিষ্কার ছিল না। কয়েকদিন পর তিনি বিদেশী সাংবাদিকদেরকে তার ভাষায় বিশ্বাসঘাতকদের জনসমক্ষে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করার দৃশ্য দেখান। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে এসব ছবি ব্যাপক প্রচার লাভ করে।
আনুমানিক বিকাল সাড়ে চারটায় আর্মি কমান্ডার ও তার সফরসঙ্গীরা পাঁচটি এমআই-৪ এবং চারটি অ্যালুয়েট হেলিকপ্টারের একটি বহর নিয়ে ঢাকায় পৌঁছান। নিয়াজি ও আমি তাদেরকে অভ্যর্থনা জানাতে যাই। মিসেস অরোরাকে সঙ্গে নিয়ে আর্মি কমান্ডার নেমে আসেন। আরো অবতরণ করেন এয়ার মার্শাল দেওয়ান, ভাইস অ্যাডমিরাল কৃষ্ণ, লেফটেন্যান্ট জেনারেল সগৎ সিং, চতুর্থ কোরের ডিভিশনাল কমান্ডারগণ ও উইং কমান্ডার একে খন্দকার। ওসমানীকে অবশ্য দেখা গেল না। নিয়াজি, লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরা ও এয়ার মার্শাল দেওয়ান গাড়ির দিকে এগিয়ে যান। আমারও এ গাড়িতেই যাবার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু মিসেস অরোরা তার স্বামীর পাশের আসন দখল করায় সেই আশা আমাকে ছাড়তে হয়। গাড়ি রওনা দিয়ে দিলে আমি অন্য গাড়িতে ঝাঁকুনি খেতে খেতে রেসকোর্স ময়দানের দিকে যাত্রা করি। আয়োজনের জন্য সময় খুব কম থাকা সত্ত্বেও অনুষ্ঠানটি মোটামুটি ভালভাবে সম্পন্ন হয়। গার্ড অব অনার পরিদর্শনের পর অরোরা ও নিয়াজি টেবিলের দিকে এগিয়ে যান। অরোরার নিয়ে আসা আত্মসমর্পণের দলিল টেবিলের উপর রাখা হয়। নিয়াজি দলিলের উপরে কৌতূহলী চোখ বুলিয়ে নিয়ে সই করেন। অরোরাও সই দেন। দলিলের উপরে সতর্ক দৃষ্টি দেয়ার সময় তার শিরোনাম লক্ষ্য করে আমি হতবুদ্ধি হয়ে যাই। সেখানে লেখা ছিল, ‘আত্মসমর্পণের দলিল, ভারতীয় স্থানীয় সময় ১৬৩১ মিনিটে স্বাক্ষর করতে হবে।’ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সময় তখন বিকাল চারটা ৫৫ মিনিট। তারপর নিয়াজি তার কাঁধ থেকে অ্যাপ্যুলেট খুলে ফেলেন এবং ল্যানিয়ার্ডসহ ৩৮ বোরের রিভলবার অরোরার হাতে ন্যস্ত করেন। তার চোখে অশ্র“। সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত জনতা তখন নিয়াজি ও পাকিস্তান বিরোধী শে¬াগান ও গালিগালাজ দিতে থাকে। রেসকোর্সের আশপাশে তেমন কোনো সৈন্য না থাকায় নিয়াজির নিরাপত্তা নিয়ে আমরা শঙ্কিত ছিলাম। আমরা কয়েকজন সিনিয়র অফিসার মিলে তার জন্য একটি বেষ্টনী রচনা করে তাকে পাহারা দিয়ে একটি ভারতীয় জীপের কাছে নিয়ে যাই। পাকিস্তানিদেরকে নিরস্ত্র করা, আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং বন্দিদেরকে ভারতে নিয়ে যাবার ব্যাপারে সগৎ সিংকে আমি ব্রিফ করি। এরপর আগরতলায় যাবার উদ্দেশে আমরা ঢাকা বিমান বন্দরে আসি। আমরা যখন অপেক্ষা করছিলাম তখন পাকিস্তান নৌবাহিনীর রিয়ার অ্যাডমিরাল শরীফ অ্যাডমিরাল কৃষ্ণকে বিদায় জানাতে আসেন। শরীফকে কৃষ্ণ পিস্তল সমর্পণ করতে বললে তিনি হোলস্টার থেকে পিস্তল বের করে তার হাতে তুলে দেন। তারপর আমাদের হেলিকপ্টার আকাশে উড়ে।
মানেকশ কিভাবে আগে থেকে আত্মসমর্পণের সময় হিসাব করে বিকাল চারটা ৩১ মিনিট নির্ধারিত করলেন অনেক ভেবেও আমি তা বুঝতে পারিনি। আমি জানতাম পার্লামেন্ট অধিবেশন চলছে। কোনো কারণে মানেকশ হয়তো প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলেন, বিকাল চারটা ৩১ মিনিটে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠিত হবে। কিভাবে হিসাব করে তিনি এই সময় বের করেছিলেন তা আজো আমার কাছে এক রহস্য। অথচ এই নির্ধারিত সময়ে অরোরা ও তার সঙ্গীরা ঢাকা বিমান বন্দরে অবতরণ করতে পারেননি। ঘটনার সময় লোকসভার অধিবেশনে যোগদানকারী পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় পরে আমাকে জানান, ঢাকায় কী ঘটছে তা নিয়ে সবাই ছিলেন খুবই উদ্বিগ্ন। তার বক্তব্য অনুযায়ী পার্লামেন্টে উপস্থিত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি বারবার বলেছিলেন, আত্মসমর্পণের শর্তাবলী নিয়ে আলোচনার জন্য ঢাকায় গিয়ে জেনারেল জ্যাকব লাঞ্চ করছেন। এটা খুবই দুঃখজনক ব্যাপার যে, এমন অনিশ্চিত অশান্ত এক পরিস্থিতিতে একটি দীর্ঘ ও আয়েসী লাঞ্চের জন্য পরবর্তী প্রজন্ম জেনারেল জ্যাকবকে মনে রাখবে!
দুর্ভাগ্যবশত কর্নেল ওসমানী এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি। তার জন্য পাঠানো হেলিকপ্টার পথে শত্র“র গুলির আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সময়মতো তা মেরামত করে তোলা সম্ভব হয়নি। তার অনুপস্থিতির ভুল ব্যাখা করা হয় এবং পরবর্তীতে তা অনেক সমস্যার জন্ম দেয়।
ফোর্ট উইলিয়ামে ফিরে সেদিনের ঘটনাবলীর রিপোর্ট লেখার জন্য অপারেশন রুমে ঢুকে পড়ি। ভোরবেলায় আমি আমার কোয়ার্টারে ফিরি। আমি সবে ঘরে ঢুকেছি এমন সময় বেল বাজলো। সানডে টাইমসের নিকোলাস টোমালিন দরজায় দাঁড়ানো। এই আত্মসমর্পণের উপরে রিপোর্ট করার জন্য তাকে হেলিকপ্টারে জায়গা দেয়া হয়নি বলে তিনি খুবই বিমর্ষ। আত্মসমর্পণ ও এই অভিযানের স্ট্র্র্যাটেজি সম্পর্কে আমি তাকে সবিস্তার বর্ণনা দিই। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে তার এ রিপোর্ট ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়।
কয়েকদিন পর নিয়াজির সমর্পিত রিভলবার পরীক্ষা করতে গিয়ে আমি বুঝতে পারি অস্ত্রটি তার নয়। পিস্তলটি সাধারণ সৈন্যের জন্য ইস্যু করা একটি ৩৮ বোরের রিভলবার। ময়লায় ব্যারেল বন্ধ। মনে হলো বেশ কিছুদিন তা পরিষ্কার করা হয়নি। ল্যানিয়ার্ডও নোংরা। ঘর্ষণে কয়েকটি জায়গা ছেঁড়া। এমন পিস্তল কোনো কমান্ডিং জেনারেলের ব্যক্তিগত অস্ত্র হতে পারে না। বরং মনে হলো নিয়াজি তার কোনো মিলিটারি পুলিশের কাছ থেকে নিয়ে তার ব্যক্তিগত অস্ত্র হিসাবে সমর্পণ করেছেন। আমার মনে হলো তার ভাগ্যে যা ঘটেছে তা তার প্রাপ্য ছিল।’
(লেখাটি ‘২৬৭ দিনের মুক্তিযুদ্ধ’ থেকে নেয়া। বইটি প্রকাশ করেছে আফসার ব্রাদার্স)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন