যুদ্ধের শুরুতেই ভারতীয়রা পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে এ দু’টি অঞ্চলের উপকূলবর্তী সাগর অবরোধ করার পরিকল্পনা হাতে নেয়। পূর্ব পাকিস্তান অবরোধে পাঠানো হয় ভারতের একমাত্র বিমানবাহী রণতরী ‘আইএনএস বিক্রম’। ‘বিক্রম’ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত ব্রিটেনে তৈরি একটি রণতরী। ১৯৭১ সালের আগে আর কখনো এ বিমানবাহী রণতরী যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। করাচি বন্দর অবরোধে বিক্রমের নেতৃত্বে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। কিন্তু বিক্রমের একটি মূল বয়লার অকার্যকর হওয়ায় এবং বিমান হামলার ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘ সমুদ্র পথ পাড়ি দেয়ার মতো গতি না থাকায় করাচি বন্দর অবরোধের পরিবর্তে এ বিমানবাহী জাহাজকে পূর্বাঞ্চলে পাঠানো হয়। যুদ্ধ ঘোষণার দিন বিক্রম আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের সর্ব উত্তরের প্রান্ত থেকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান সমুদ্র বন্দর চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেয়। বিক্রমকে বাধাদানে পাকিস্তান ‘গাজী’ নামে তাদের একটি সাবমেরিন পাঠায়। গাজী ছিল যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি একটি পুরনো সাবমেরিন। এ সাবমেরিন ভারতের বিশাখাপট্টম পোতাশ্রয়ের আশপাশে মাইন স্থাপন করে। মাইন পুঁততে গিয়ে ভারতীয় ডেস্ট্রয়ার ‘আইএনএস রাজপুত’ থেকে নিক্ষিপ্ত ডেপথ চার্জের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবে পহেলা অথবা ২ ডিসেম্বর গাজী নিমজ্জ্বিত হয়। একজন মৎস্যজীবী বিশাখাপট্টম বন্দরের প্রবেশমুখে সাবমেরিনের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পায়। পরবর্তীতে ভারতীয় নৌবাহিনীর অফিশিয়াল ভাষ্যে বলা হয়, ৪ ডিসেম্বর ইস্টার্ন ফ্লীটের যুদ্ধজাহাজ ‘গাজী’কে ডুবিয়ে দিয়েছে। গাজী নিমজ্জ্বিত হলে বিক্রম নির্বিঘেœ লক্ষ্যস্থলে পৌঁছায়।
৪ ডিসেম্বর প্রথম বিক্রমের ডেক থেকে জঙ্গিবিমান উড্ডয়ন করে এবং কক্সবাজার ও চিড়িঙ্গায় আঘাত হানে। প্রথম মিশনে ৮টি সী হক বিমান অংশগ্রহণ করে। একইদিন বিকেলে দ্বিতীয় মিশনে চট্টগ্রাম বিমান বন্দরে বোমাবর্ষণ করা হয়। সেদিন রাতে বিক্রম মংলা ও খুলনার উদ্দেশে যাত্রা করে। মংলা, খুলনা ও বরিশালে মিশন শেষ করে এ ভারতীয় বিমানবাহী রণতরী ফের চট্টগ্রামে ফিরে আসে। দ্বিতীয় যাত্রায় বিক্রম থেকে উড্ডয়নকারী বিমানগুলো চট্টগ্রাম পোতাশ্রয়, বিমান বন্দর ও চট্টগ্রামের সংযোগ সড়কগুলোতে বোমাবর্ষণ করে। বোমাবর্ষণ করায় চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙ্গর করা জাহাজগুলো হয়তো উল্টে যায় নয়তো অর্ধ নিমজ্জ্বিত হয়। ফেনীতেও বোমাবর্ষণ করা হয়। ১২ ডিসেম্বর ভারতের অনুমতি নিয়ে ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্সের তিনটি এবং জাতিসংঘের একটি সি-১৩০ হারকিউলিস বিমান কুর্মিটোলা বিমান বন্দরের অক্ষত রানওয়েতে অবতরণ করে এবং ব্রিটিশ ও আমেরিকান নাগরিকদের ঢাকা থেকে সরিয়ে নেয়। ব্রিটিশ বিমানের ক্রু জানায় যে, বিক্রম থেকে উড়ে গিয়ে ভারতীয় বিমান তাদের উপর বোমাবর্ষণ করে। সৌভাগ্যক্রমে বোমা লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ায় তাদের কোনো ক্ষতি হয়নি। ভারতীয় বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চীফ মার্শাল পি. সি. লাল তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘মাই ইয়ার্স উইথ দ্য আইএএফ’-এ তিনি ব্রিটিশ যাত্রীবাহী বিমানে বোমাবর্ষণের সত্যতা স্বীকার করেন। বঙ্গোপসাগরে ভারতীয় নৌবাহিনীর উপস্থিতি ছিল একতরফা। পাকিস্তানের আধুনিক তিনটি সাবমেরিন আরব সাগরে নিয়োজিত থাকায় ভারতীয় নৌবাহিনী পূর্বাঞ্চলে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। পাকিস্তান বেশি জোর দিয়েছিল স্থলযুুদ্ধের উপর । উভচর ও নৌশক্তির সমাবেশ ঘটাতে দেশটি চরমভাবে ব্যর্থ হয়।
(লেখাটি ‘২৬৭ দিনের মুক্তিযুদ্ধ’ থেকে নেয়া। বইটি প্রকাশ করেছে আফসার ব্রাদার্স)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন