বুধবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২০

সুলতান সোলেমানের জীবনের শেষ অভিযান

১৫৬৬ সালের ৬ আগস্ট হাঙ্গেরীর সিগেৎভার (Szigetvar) দুর্গ অবরোধ করা হয়। সিগেৎভার দুর্গ অবরোধ ছিল সুলতান সোলেমানের জীবনের শেষ অভিযান। ১৫৬৬ সালের জানুয়ারিতে তিনি শেষবার যুদ্ধযাত্রা করেন। এ অভিযানকালে নিজের তাঁবুতে স্বাভাবিকভাবে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সিগেৎভারকে কোনো কোনো সময় সিগেত-ও (Sziget) বলা হয়। এ দুর্গ সুলতান সোলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টের ভিয়েনা অগ্রযাত্রায় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নিকোলা সুবিচ জিরিনস্কির নেতৃত্বে হ্যাবসবার্গের সৈন্যবাহিনীর সাথে সুলতান সোলেমানের নেতৃত্বে অটোমান সৈন্যবাহিনীর মধ্যে এ লড়াই হয়। হ্যাবসবার্গ সাম্রাজ্য অটোমান সাম্রাজ্যের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। তবে বিজয়ী হলেও একই বছর ভিয়েনায় অটোমান সম্প্রসারণ থেমে যায়। ১৬৮৩ সালে ভিয়েনা যুদ্ধের আগে এ নগরীর প্রতি অটোমান হুমকি দেখা দেয়নি। বিজয়ী হওয়ার জন্য অটোমানদের চড়া মূল্য দিতে হয়। মাত্র এক মাসে ২০ হাজারের বেশি সৈন্য নিহত হয়। রবার্ট উইলিয়াম ফ্রেসারের মতে, সিগেৎভার দুর্গ অবরোধকালে ১০ হাজারের বেশি কামানের গোলা নিক্ষেপ করা হয়।
 
পূর্ববর্তী ঘটনা 
সোলেমান সিগেৎভার অভিযানে যোগদানে তার পুত্র সেলিমকে নির্দেশ দেননি। সেলিম ছিলেন তখন তার একমাত্র জীবিত পুত্র। তবে তিনি তাকে মদ্যপানে নিষেধ করেন। সেলিম বিরত না হলে সোলেমান তার পুত্রের মদ্যপানের এক সঙ্গীকে মৃত্যুদণ্ড দেন। সেলিমের পুত্র মুরাদ তার পিতার কাছে যেতে একটি গ্যালে চাইলে সোলেমান তাকে দুই মাস্তুলওয়ালা একটি জাহাজ দেন। ১৫৬২ সালের পহেলা আগস্ট তিনি বিয়ে দেয়ার জন্য সেলিমের তিন কন্যাকে ডেকে পাঠান। এসমিহান সুলতানাকে বিয়ে দেয়া হয় সকোল্লু মেহমুদ পাশার কাছে, গাভহারহান সুলতানাকে কাপুদান পাশা পিয়ালি পাশার কাছে এবং শাহ সুলতানাকে প্রধান বাজপাখি বহনকারী হাসান আগার কাছে। একইদিন তিনি দামাত আবদুল করিম পাশার কাছে মরহুম শাহজাদা মোস্তফার কন্যা নার্গিস শাহকে বিয়ে দেন।  সকোল্লুকে তিনি উজিরে আজমের পাশাপাশি সারাস্কার পদে উন্নীত করেন। অটোমান বংশের সাথে বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়ে সকোল্লু সুলতান ছাড়া সব ক্ষমতার মালিক হয়ে যান।                            
     পবিত্র রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ম্যাক্সিমিলিয়ান ছিলেন হ্যাবসবার্গের শাসক এবং ক্রোয়েশীয় অভিজাত ও অভিজ্ঞ সেনাপতি নিকোলা সুবিচ জিরিনস্কি ছিলেন সিগেৎভার দুর্গের কমান্ডার। চূড়ান্ত লড়াইয়ে জিরিনস্কি নিজে এবং তার দুর্গের ২ হাজার তিন শো সৈন্যের প্রায় সবাই নিহত হয়। যুুদ্ধের শেষ দিন নিহত হয় ৬ শো সৈন্য। সুলতান সোলেমানের মূল লক্ষ্য ছিল উত্তর হাঙ্গেরীর দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ইগার (Eger)। কিন্তু তিনি শুনতে পান যে, সিকলোস শহরে জিরিনস্কি তার বাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়েছেন এবং সেখানে তিনি একটি বিরাট অটোমান সরবরাহ বহর ধ্বংস করেছেন। জিরিনস্কির এ তৎপরতার জবাবে সুলতান সোলেমান তার মূল পরিকল্পনা সংশোধন করেন এবং সিগেৎভারে জিরিনস্কির বিরুদ্ধে অগ্রযাত্রা করেন। নিকোলা সুবিচ জিরিনস্কি ছিলেন ক্রোয়েশিয়ার একজন শীর্ষ ভূস্বামী, সীমান্ত যুদ্ধে অভিজ্ঞ এবং ১৫৪২ থেকে ১৫৫৬ সাল পর্যন্ত একজন বান (ক্রোয়েশীয় রাজকীয় প্রতিনিধি)। প্রাথমিক জীবনে ভিয়েনা অবরোধে তিনি কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন এবং একটি সফল সামরিক জীবন অনুসরণ করেন। 
    ১৫২৬ সালে মোহাকচ যুদ্ধের পর হাঙ্গেরী ও ক্রোয়েশিয়া উভয় দেশের অভিজাতরা প্রথম ফার্ডিনান্ডকে রাজা মনোনীত করেন। অন্যদিকে টান্সিলভানিয়ার ভইভড জন জাপোলিয়া হাঙ্গেরীর সিংহাসন দাবি করেন। পরস্পরবিরোধী দুজন রাজার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় হ্যাবসবার্গ ও তার মিত্রদের সাথে অটোমান সাম্রাজ্যের উপর্যুপরি যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধ লিটল ওয়ার ইন হাঙ্গেরী নামে পরিচিত। ১৫২৯-১৫৫২ সাল নাগাদ স্থায়ী যুদ্ধে উভয়পক্ষের বিপুল প্রাণহানি ঘটে। ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি হাঙ্গেরী ব্যাপক ভূখণ্ড হারায়। তবে ইগার অবরোধে বিজয়ী হলে তাদের ক্ষতি অনেকটা পুষিয়ে যায়। ইগারে পরাজিত হলে অটোমানরা ১৫৬৬ সালে ইউরোপে নতুন করে দিগি¦জয় শুরু করে। সিগেৎভার অভিযান নাগাদ হাঙ্গেরীতে অটোমান অভিযান চলতে থাকে। ১৫৬৬ সালের ৬ আগস্ট থেকে ৮ সেপ্টেম্বর নাগাদ সিগেৎভার যুদ্ধ স্থায়ী হয়। এ যুদ্ধকে এত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয় যে, ফরাসি ধর্মযাজক ও রাষ্ট্রনায়ক কার্ডিনাল রিচেলিউ মন্তব্য করেছিলেন, এ যুদ্ধ সভ্যতাকে রক্ষা করেছে। সিগেৎভার যুদ্ধ হাঙ্গেরী ও ক্রোয়েশিয়ায় এখনো বিখ্যাত এবং দ্য সীজ অব সিগেৎ শিরোনামে হাঙ্গেরীর মহাকাব্যিক কবিতা এবং নিকোলা সুবিচ জিরিনস্কি শিরোনামে ক্রোয়েশিয়ান নাটক রচনায় অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। 
                                                                                                                    পটভূমি
১৫২৬ সালের ২৯ আগস্ট মোহাকচের যুুদ্ধে রাজা দ্বিতীয় লুইয়ের নেতৃত্বাধীন হাঙ্গেরী রাজ্যের সৈন্যবাহিনী সোলেমানের নেতৃত্বাধীন অটোমান সৈন্যবাহিনীর কাছে পরাজিত হয়। লড়াইকালে রাজা লুই নিহত হন। রাজা লুই নিঃসন্তান হওয়ায় হাঙ্গেরী রাজ্য ভেঙ্গে যায়। হাঙ্গেরী ও ক্রোয়েশিয়া উভয়ে বিতর্কিত ভূখণ্ডে পরিণত হয়। তাদের ওপর হ্যাবসবার্গ ও অটোমান সাম্রাজ্যের ভূখণ্ডগত দাবি ছিল। হ্যাবসবার্গ রাজবংশের সন্তান ও রোমান সম্রাট পঞ্চম চার্লসের ভাই প্রথম ফার্ডিনান্ড নিহত রাজা দ্বিতীয় লুইয়ের বোনকে বিয়ে করেন এবং হাঙ্গেরী ও ক্রোয়েশিয়া উভয় দেশের অভিজাতরা তাকে রাজা মনোনীত করেন। হাঙ্গেরীর সিংহাসন নিয়ে রাজা ফার্ডিনান্ড ও টান্সিলভানিয়ার ভইভড জন জাপোলিয়ার মধ্যে বিরোধ বাধে। সুলতান সোলেমান জাপোলিয়াকে গোটা হাঙ্গেরীর রাজা বানিয়ে দেয়ার প্রতিশ্র“তি দেন। ফার্ডিনান্ড গোটা হাঙ্গেরীতে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় অগ্রযাত্রা করেন এবং ১৫২৭ সালে জন জাপোলিয়ার কাছ থেকে রাজধানী বুদা কেড়ে নেন। ১৫২৯ সালে অটোমানদের পাল্টা হামলায় ফার্ডিনান্ড তার সব ভূখণ্ড হারান। সুলতান সোলেমান হাঙ্গেরী থেকে ফার্ডিনান্ডের সৈন্যবাহিনীকে ছুঁড়ে ফেলে দেন এবং রাজধানী বুদায় প্রবেশ করেন। বুদা প্রদেশ নামে হাঙ্গেরীর মূল ভূখণ্ডকে অটোমান সাম্রাজ্যে একীভূত করা হয়। ১৫২৯ সালে ভিয়েনা অবরোধ ছিল অস্ট্রিয়ার রাজধানী দখলে সুলতান সোলেমানের প্রথম প্রচেষ্টা। এ অবরোধ অটোমানদের শক্তির সর্বোচ্চ সীমা নির্দেশ করে এবং মধ্য ইউরোপে অটোমান সম্প্রসারণের চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে চি‎িহ্নত হয়। 
    ১৫৬৫ ও ১৫৬৬ সালের গোড়ার দিকে সুলতান সোলেমান ও পবিত্র রোমান সম্রাট ম্যাক্সিমিলিয়ানের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ম্যাক্সিমিলিয়ান অটোমান বে তেল্লি হাসান পাশার অধিকৃত ভূখণ্ড ফেরত দাবি করছিলেন। আলোচনা ব্যর্থ হলে ম্যাক্সিমিলিয়ান যুদ্ধ ঘোষণা করেন এবং উজিরে আজম সকোল্লু মেহমেদ পাশা তার ভাতিজা বসনিয়ার সকোল্লু মোস্তফা বে’কে ম্যাক্সিমিলিয়ানের বিরুদ্ধে অগ্রযাত্রা করার নির্দেশ দেন। মোস্তফা বে ক্রুপা ও ডাভোর দখলে সক্ষম হন। সুলতান সোলেমান অবিলম্বে রোমান সম্রাট ম্যাক্সিমিলিয়ানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন এবং উজিরে আজম সৈন্যবাহিনীর অগ্রযাত্রার ব্যবস্থা করেন। তিনি অগ্রভাগে যাত্রা করেন এবং সুলতানের আগমনের প্রস্তুতি নেন।       
 
লিটল ওয়ার                  
১৫২৯-১৫৫২ সাল পর্যন্ত বছরগুলো লিটল ওয়ার হিসেবে পরিচিত। ১৫২৯ সালে সুলতান সোলেমানের ভিয়েনা অবরোধ ব্যর্থ হলে ১৫৩০ সালে হৃত ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারে রাজা ফার্ডিনান্ড পাল্টা হামলা চালান। জন জাপোলিয়া বুদার ওপর তার হামলা নস্যাৎ করে দেন। তবে ফার্ডিনান্ড গ্রান (ইস্টারগম) এবং গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সীমান্ত দানিয়ুব বরাবর আরো কয়েকটি বন্দর দখলে সফল হন। ১৫৩২ সালে সুলতান সোলেমান জবাব দেন। তিনি এক লাখ ২০ হাজার সৈন্য নিয়ে পুনরায় ভিয়েনা অবরোধ করেন। ফার্ডিনান্ড গান্স (কোসেগ) রক্ষায় মাত্র ৭ শো সৈন্য রেখে পিছু হটেন। এসব সৈন্যের কোনো কামান ছিল না। অটোমান উজিরে আজম ইব্রাহিম পাশা কোসেগ দুর্গের দুর্বল প্রতিরক্ষা আঁচ করতে পারেননি। অবরোধ শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে সুলতান সোলেমান তার সাথে যোগদান করেন। 
   ক্রোয়েশীয় ক্যাপ্টেন নিকোলা জুরিসিচ ও তার ৮০০ সৈন্যের দুর্গ ২৫ দিনের বেশি অটোমানদের ঊনিশটি পূর্ণাঙ্গ হামলা এবং বিরামহীন গোলাবর্ষণ মোকাবিলা করে। উদার শর্তে শহরকে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দেয়া হয়। সুলতান সোলেমান ও ফার্ডিনান্ডের মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হলে অটোমানরা পিছু হটে। হ্যাবসবার্গ রাজবংশ অটোমানদের আশ্রিত জন জাপোলিয়াকে হাঙ্গেরীর রাজা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এ চুক্তি ফার্ডিনান্ড ও জন জাপোলিয়া কাউকে সন্তুষ্ট করতে না পারায় সীমান্ত বরাবর তাদের সৈন্যবাহিনী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। ১৫৩৭ সালে ফার্ডিনান্ড চুক্তি ভঙ্গ করে ওসিজেকে জন জাপোলিয়ার সৈন্যবাহিনীকে অবরোধ করেন। মোহাকসের মতো এ অবরোধ একটি বিপর্যয়ে পরিণত হয়। অটোমান উদ্ধারকারী বাহিনী অস্ট্রীয়দের গুঁড়িয়ে দেয়। পুনরায় ভিয়েনা আক্রমণ করার পরিবর্তে সুলতান সোলেমান দক্ষিণ ইতালির ওট্রান্টোতে অভিযান চালান। ১৫৩৮ সালে প্রিভেজায় নৌযুদ্ধে অটোমানদের বিজয় হ্যাবসবার্গ-নেতৃত্বাধীন জোটের আরেকটি পরাজয় হিসেবে চি‎িহ্নত হয়। ১৫৪০ সালে জন জাপোলিয়া পরলোকগমন করলে তার শিশু পুত্র জন দ্বিতীয় সিগিসমান্ড জাপোলিয়া তার স্থলাভিষিক্ত হন এবং তার কাছে টান্সিলভানিয়ার শাসনভার অর্পণ করা হয়। সিগিসমান্ডের রাজত্বের অধিকাংশ সময় সুলতান সোলেমানের অব্যাহত সমর্থনে তার মা ইসাবেলা জাগিওলন  দেশ শাসন করেন। ১৫৭০ সালে সিংহাসন ত্যাগ করা নাগাদ দ্বিতীয় সিগিসমান্ড হাঙ্গেরীর নামমাত্র রাজা হিসেবে বহাল থাকেন এবং দেশকে হ্যাবসবার্গ শাসনে ন্যস্ত করেন। ইসাবেলা জাগিওলনকে সহায়তা দানের আহক্ষানে অটোমানরা সাড়া দেয় এবং বুদা অবরোধ করে। ১৫৪১ সালে বুদা অবরোধে হ্যাবসবার্গ আবার শোচনীয় পরাজয় বরণ করে। ১৫৪৩ সালের এপ্রিলে সুলতান সোলেমান হাঙ্গেরীতে আরেকটি অভিযান চালান এবং ব্রান ও অন্যান্য বন্দর দখল করে নেন। এতে হাঙ্গেরীর অধিকাংশ ভূখণ্ড অটোমান নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসে। ১৫৪৩ সালের আগস্টে অটোমানরা ইস্টারগম (Esztergom) অবরোধে বিজয়ী হয়। সুলতান সোলেমান ১৫৪৩ সালের ২৫ জুলাই হাঙ্গেরীর এ শহর অবরোধ করেন এবং ১০ আগস্ট শেষ হয়। দুসপ্তাহের অবরোধে অটোমানরা বিজয়ী হয়। চুক্তি অনুযায়ী হাঙ্গেরী অভিযানে ফরাসি সৈন্যরা অটোমানদের সাথে যোগদান করে। ১৫৪৩-৪৪ সালে অটোমানদের সহায়তায় একটি ফরাসি আর্টিলারি ইউনিট পাঠানো হয়। এ ইউনিটকে অটোমান সৈন্যবাহিনীতে সংযুক্ত করা হয়। ১৫৪২ সালে অস্ট্রিয়ার রাজা ফার্ডিনান্ড বুদা পুনর্দখলের ব্যর্থ চেষ্টা করায় ইস্টারগম অবরোধ করা হয়। ইস্টারগম অবরোধ শেষ হলে তিনটি হাঙ্গেরীয় শহর শেকেসফারভার (Szekesfehervar), সিকলোস (Siklos) ও সিগেদ (Szeged) দখল করা হয়। এ তিনটি শহর দখল করা হলে বুদার নিরাপত্তা আরো নিশ্চিত হয়। 
      পশ্চিম ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরে ফরাসি মিত্রদের তৎপরতার কোনো খবর না পাওয়ায় সোলেমান ভিয়েনার সামনে এগিয়ে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন। অটোমানদের সফল অভিযানের পর ফ্রান্সের রাজা প্রথম ফ্রান্সিসের মধ্যস্থতায় ১৫৪৫ সালে  রোমান সম্রাট পঞ্চম চার্লসের সাথে এক বছর মেয়াদী একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পারস্যের বিরুদ্ধে অভিযানে ব্যস্ত থাকায় সুলতান সোলেমান নিজেও বৈরিতা অবসানের পক্ষে ছিলেন। দুবছর পর ১৫৪৭ সালে আদ্রিয়ানোপল চুক্তিতে পঞ্চম চার্লস ও ফার্ডিনান্ড হাঙ্গেরীতে অটোমানদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ স্বীকার করে নেন। এমনকি ফার্ডিনান্ড উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলীয় হাঙ্গেরীতে হ্যাবসবার্গের নিয়ন্ত্রণে বিনিময়ে বার্ষিক ত্রিশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা পরিশোধে সম্মত হন। ১৫৫২ সালে কারা আহমদ পাশা ও সকোল্লু মেহমুদ পাশার নেতৃত্বে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার অটোমান সৈন্য উত্তর হাঙ্গেরীতে ইগার দুর্গ অবরোধ করে। সুলতান সোলেমান ইগার আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়া নাগাদ হ্যাবসবার্গ ও অটোমানদের মধ্যে আরেকটি চুক্তি হয়। ইস্তভান ডোবোর নেতৃত্বে হাঙ্গেরীর দুহাজার তিন শো সৈন্য অটোমান হামলা প্রতিহত এবং দুর্গ রক্ষা করে। ইগার দুর্গ অবরোধে অটোমানরা ১৬টি বৃহৎ এবং দেড় শো মাঝারি আকারের কামান এবং দুহাজার উট ব্যবহার করে। পক্ষান্তরে প্রতিরোধকারীদের কাছে ছিল ৬টি বড় কামান, এক ডজন ক্ষুদ্র কামান এবং তিন শো ট্রেন্স গান। উভয়পক্ষের শক্তিতে এ ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও ইগার দুর্গ ৫টি বৃহত্তম অটোমান হামলা এবং কামানের বিরামহীন গোলাবর্ষণ প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। অবরোধ শেষ হওয়ার আগে দুর্গের অভ্যন্তরে কামানের প্রায় ১২ হাজার গোলা পতিত হয়। ৩৯ দিনের রক্তক্ষয়ী অবরোধ শেষে অটোমানরা ইগার থেকে পিছু হটে। ইস্তভান ডোবোর দুজন দেহরক্ষীসহ এক-তৃতীয়াংশ প্রতিরোধকারী নিহত হয়। ইগার অবরোধ নিষ্ফল প্রমাণিত হয় এবং হ্যাবসবার্গ বিজয়ী হলে হাঙ্গেরীর ভৌগোলিক ক্ষতির অবসান ঘটে। ইগারের অস্তিত্ব বজায় থাকায় অস্ট্রীয়রা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, হাঙ্গেরী নিয়ে লড়াই তখনো শেষ হয়নি এবং ১৫৬৬ সালে হাঙ্গেরীতে অটোমানরা পুনরায় অভিযান চালায়।

১৫৬৬ সালের অভিযান
১৫৬৬ সালের জানুয়ারিতে সুলতান সোলেমান তার জীবনের শেষ যুদ্ধযাত্রা করেন। তার বয়স ছিল তখন ৭২ বছর। গেঁটে রোগে আক্রান্ত হওয়ায় তিনি পাল্কিকে চড়ে যাত্রা করেন। তিনি নামমাত্র ২৩তম সামরিক অভিযানে নেতৃত্ব দেন। ১৫৬৬ সালের পহেলা মে সুলতান একটি বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে কন্সটান্টিনোপল ত্যাগ করেন। জামুনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হওয়ার সময় সৈন্যবাহিনীর একটি অংশ ভারাজদিন অতিক্রম করে এবং ভিয়েনা অভিমুখে অগ্রযাত্রা করার আগে ইগারে আঘাত হানে। নিকোলা সুবিচ জিরিনস্কি অটোমান সানজাক বে তিরহাল মোহাম্মদকে পরাজিত এবং তাকে ও তার পুত্রকে হত্যা করেন। এছাড়া তিনি ১৭ হাজার ডুকাট (স্বর্ণমুদ্রা) আটক করেন। সকোল্লু মেহমেদ পাশা কুর্ণিশ করে সুলতানকে এ খবর দেন। খবরটি খুব গুরুত্বপূর্ণ না হলেও সুলতান চিন্তিত হন। তিনি সারাস্কার সকোল্লুকে বলেন, আমরা সিগেৎভারে যাবো। সকোল্লু নির্দেশ পালনে প্রস্তুত হন। সেখানে হ্যাবসবার্গ সৈন্যবাহিনী শান্তি বিনষ্ট এবং অটোমান আশ্রিত তরুণ রাজা জন সিগিসমান্ডকে হয়রানি করছিল। আরো উত্তরে এবলাউয়ে অস্ট্রীয় সৈন্যদের দেখা গিয়েছিল। 
     সকোল্লু সৈন্যদের যাত্রাপথ পরিবর্তনের কোনো কারণ দেখছিলেন না। সিগেৎভার ছিল পানি পরিবেষ্টিত একটি ছোট্ট গ্রাম। সেখানে একটি শক্তিশালী দুর্গ ছাড়া আর কিছু ছিল না। নিকোলা জিরিনস্কি এ দুর্গ দখল করে নিয়েছিলেন। সিগেৎভারের সাথে মাল্টার মিল থাকায় সোলেমান বিস্মিত হন। সিগেৎভারে তিনি পরাজিত হতে প্রস্তুত নন। পরদিন তিনি ঘোড়ার গাড়িতে এ গ্রামের পশ্চিমে যাবার ঘোষণা দেন। সকোল্লু মাথা তোলেন। তিনি দ্রুত চিন্তা করছিলেন। হাজার হাজার সৈন্যের যাত্রাপথ কিভাবে ঘুরিয়ে দেয়া যায় তা নিয়ে ভাবছিলেন। তিনি মুখ খোলার আগেই সোলেমান বললেন, মেহমেদ সকোল্লু, আমি সেখানে যেতে চাই। সুলতান কঠোর কণ্ঠে নির্দেশ দেয়ায় সারাস্কার নীরব হয়ে যান। সকোল্লু ভাবছিলেন তার মহান প্রভু সত্যি নির্বোধ কিনা। তিনি মাথা নিচু করে বললেন, জাঁহাপনা আমি আপনার নির্দেশ শুনতে পেয়েছি। তবে ঘোড়ার গাড়ির চেয়ে নৌকা ভালো হবে। কারাদেনিজে (কৃষ্ণসাগর) বহু গ্যালে আছে। আপনি জলপথে সিগেৎভারে যেতে পারেন। সকোল্লু নিশ্চিতভাবে সিগেৎভারের রাস্তা চিনতেন। কেননা দ্রাভি নদীর তীরে এবং পর্বতমালার পশ্চিমে ছিল তার পৈত্রিক বাড়ি। 
    দ্রাভি নদীতে সুলতানের জন্য একটি প্রমোদতরীর ব্যবস্থা করা হয়। এতে ছিল সোনালী রংয়ের একটি অর্ধচন্দ্র এবং চন্দ্রাতপ। সুলতান চন্দ্রাতপের নিচে শুয়ে রাস্তার দুপাশের দৃশ্য দেখছিলেন। তার বামদিকে ছিল পর্বত। তিনি রাস্তায় লোকজন দেখতে পান। প্রমোদতরীর পাশাপাশি কয়েকটি ষাড় একটি বিশাল কামান বহন করে নিয়ে যাচ্ছিল। কামানের নাম ছিল কাৎজিয়ানার। অস্ট্রিয়ার সেনাপতি কাৎজিয়ানারের নামানুসারে এ কামানের নামকরণ করা হয়। একবার সেনাপতি কাৎজিয়ানার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে অটোমানদের কাছে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সোলেমান একটি মুচকি হাসি দেন। ক্ষণকাল তিনি ভাবছিলেন কামান ও গোলাবারুদ না থাকলে অথবা সাগর পাড়ি দেয়ার জন্য জাহাজ না থাকলে কী উপায় হতো। সিগেৎভারের উপকণ্ঠে সোলেমানের জন্য একটি তাঁবু খাটানো হয়। তিনি তাঁবুর দিকে এগিয়ে গেলে জেনিসারির আগা তাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য ঘোড়ার গাড়ির দরজা পর্র্যন্ত এগিয়ে যান। আগা তাকে নিচে নামতে অনুরোধ করেন। লাল টকটকে কাপড়ে সিগেৎভার দুর্গের শীর্ষদেশ আচ্ছাদিত ছিল। সোলেমান দুর্গের দিকে তাকান। এসময় অশ্বারোহী সৈন্যরা তার চারপাশে গিজগিজ করছিল এবং বাতাসে তার পতাকা উড়ছিল। দুর্গ থেকে সূর্যের আলো ঠিকরে পড়ছিল। খ্রিস্টানরা দুর্গে ধাতব প্লেট লাগিয়ে রাখে যাতে সূর্যের আলো ঝলসে ওঠে। সুলতান সোলেমানের আগমন টের পেয়ে দুর্গ থেকে কামানের গোলাবর্ষণ করা হয়। সুলতান সোলেমান সিগেৎভার অবরোধে উজিরে আজম সকোল্লু মেহমেদ পাশার নেতৃত্বে একটি সৈন্যবাহিনী পাঠান। অন্যদিকে তিনি অবস্থান করছিলেন হারসাঙ্গে। বুদিনের কমান্ডার আরসালান পাশা ভারপালোটা, ভেজপ্রেম ও টাটা শহর হারান। সুলতান আরসালান পাশার মাথা কেটে আনার জন্য ১৫ জন সৈন্যের একটি প্লাটুন পাঠান। কিন্তু আরসালান তিনদিন আগে তার সৈন্যদের পরিত্যাগ করেন এবং সুলতানের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য রওনা দিয়েছিলেন। সুলতান উজিরে আজম সকোল্লু মেহমেদ পাশাকে একটি চিঠি দেখান। চিঠিতে আরসালান সুলতানকে অবজ্ঞা করেছিলেন। ৩ আগস্ট আরসালান ১৫ জন ভারি অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে সুলতানের তাঁবুতে এসে উপস্থিত হন। এ সময় উজিরে আজম তার আচরণের জন্য তাকে ভর্ৎসনা করেন এবং তাকে দেশদ্রোহিতার জন্য অভিযুক্ত করেন। উজির তার পদ কেড়ে নেন এবং তার ভাতিজা সকোল্লু মোস্তফা বে’কে তার স্থলে নিয়োগ দেন। সুলতান উজিরে আজম সকোল্লু মেহমেদ পাশার পুত্র কুর্ট বে ও হাসান বে’কে সাথে নিয়ে পিসিসে এসে পৌঁছান। ৪৯ দিন অগ্রযাত্রার পর সোলেমানের সৈন্যবাহিনী ১৫৬৬ সালের ২৭ জুন বেলগ্রেডে পৌঁছে। বেলগ্রেডে তিনি জন সিগিসমান্ড জাপোলিয়ার সাথে মিলিত হন। সিকলোসে একটি অটোমান দুর্গে জিরিনস্কির সফল আক্রমণের সংবাদ পেয়ে সুলতান সোলেমান ইগারে তার অভিযান স্থগিত রাখার ঘোষণা দেন এবং জিরিনস্কির হুমকি নির্মূলে সিগেৎভার দুর্গ দখলের সিদ্ধান্ত নেন।

অবরোধ  
১৫৬৬ সালের পহেলা মে উজিরে আজমসহ সুলতান সোলেমান কন্সটান্টিনোপল ত্যাগ করেন। তারা সোফিয়া, নিস ও বেলগ্রেডের মধ্য দিয়ে সেমলিনে অগ্রযাত্রা করেন। সেমলিনে তরুণ জন জাপোলিয়া সুলতানকে সম্মান জানানোর জন্য হাজির হন। তাকে আন্তরিকভাবে অভ্যর্থনা জানানো হয়। সেমলিন থেকে আরলাউ অবরোধে সুলতানের অগ্রযাত্রা করার কথা ছিল। কিন্তু তিনি মনোভাব পরিবর্তন করেন এবং শক্তিশালী সিগেৎভার দুর্গ অবরোধের সিদ্ধান্ত নেন। ১৫৬৬ সালের ২ আগস্ট অটোমান অগ্রবর্তী বাহিনী সিগেৎভারে এসে পৌঁছে। দুর্গ রক্ষকরা বের হয়ে যাবার কয়েকটি সফল অভিযান চালায় এবং এতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অটোমান সৈন্য নিহত হয়। ৫ আগস্ট সুলতান সোলেমান উজিরে আজম সকোল্লু মেহমেদ পাশার পুত্র কুর্ত বে এবং হাসান বে’সহ মূল বাহিনী নিয়ে পিসিচে পৌঁছান এবং সাইমিলিহোভ পাহাড়ে তার শাহী তাঁবু খাটান। এ তাঁবু থেকে তিনি যুদ্ধের পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করতে পারতেন। সুলতান তার তাঁবুতে অবস্থান করতেন। এখানে তিনি উজিরে আজম মেহমেদ পাশার কাছ থেকে মৌখিকভাবে যুদ্ধের অগ্রগতির খবর পেতেন। উজিরে আজম সকোল্লু মেহমেদ পাশা ছিলেন অটোমান সৈন্যবাহিনীর অপারেশনাল কমান্ডার। কাউন্ট জিরিনস্কি দেখতে পান যে, তিন শো কামানসহ দেড় লাখ শত্র“ সৈন্য তাকে অবরোধ করে ফেলেছে। তিনি অবরোধের আগে ২ হাজার তিন শো হাঙ্গেরীয় ও ক্রোয়েশীয় সৈন্য সমবেত করেছিলেন। এ বাহিনীতে ছিল তার ব্যক্তিগত এবং তার বন্ধু-বান্ধব ও মিত্রদের আরো কিছু সৈন্য। প্রতিরোধকারীদের অধিকাংশ ছিল ক্রোয়েশীয়। সৈন্যবাহিনী ও কমান্ডে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হাঙ্গেরীয় প্রতিনিধিত্ব ছিল। জলাভূমি সিগেৎভারকে তিন ভাগে বিভক্ত করে রেখেছিল। একটি ছিল পুরনো শহর, আরেকটি নয়া শহর এবং তৃতীয়টি দুর্গ। সেতু ও সড়ক এক অংশের সাথে আরেক অংশের সংযোগ রক্ষা করছিল।    
   সিগেৎভার দুর্গ নির্দিষ্টভাবে কোনো উঁচু ভূমির ওপর নির্মাণ করা হয়নি। তবে কোনো আক্রমণকারীর পক্ষে সেখানে সরাসরি প্রবেশ করা সম্ভব ছিল না। অন্য দুটি বেইলি ব্রিজ দখল করা ছাড়া মূল দুর্গে পৌঁছানো যেতো না। সুলতান সোলেমান দুর্গের সামনে এসে প্রাচীরে লাল কাপড় ঝুলতে দেখতে পান। মনে হচ্ছিল যেন বিশাল কোনো কামান থেকে গোলা ছুঁড়ে কোনো শক্তিশালী রাজাকে অভ্যর্থনা জানানো হবে অথবা কোনো বৌভাতের আয়োজন করা হয়েছে। সুলতান দুর্গে সর্বাত্মক হামলার নির্দেশ দিলে ৬ আগস্ট অবরোধ শুরু হয়। সাফল্যের সাথে এ হামলা প্রতিহত করা হয়। সংখ্যায় অত্যন্ত নগণ্য হলেও ভিয়েনা থেকে রাজকীয় সৈন্যবাহিনী তাদের জন্য কোনো সহায়তা পাঠায়নি। এক মাসের বেশি রক্তাক্ত লড়াইয়ের পর অবশিষ্ট প্রতিরোধকারীরা শেষ বুঝাপড়া করার জন্য পুরনো শহরে পিছু হটে। সুলতান জিরিনস্কিকে আত্মসমর্পণে রাজি করানোর চেষ্টা করেন। তাকে অটোমান সার্বভৌমত্বের অধীনে ক্রোয়েশিয়ার নেতৃত্ব গ্রহণের প্রস্তাব দেন। কিন্তু কাউন্ট জিরিনস্কি কোনো জবাব না দিয়ে লড়াই চালিয়ে যান। দুর্গের পতন অবশ্যম্ভাবী বলে প্রতীয়মান হচ্ছিল। কিন্তু অটোমান হাইকমান্ড ছিল দ্বিধান্বিত। 
                                                                                                                       
সুলতান সোলেমানের মৃত্যু
১৫৬৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সুলতান সোলেমান তার তাঁবুতে মৃত্যুবরণ করেন। তবে তার মৃত্যু সংবাদ গোপন রাখা হয়। শুধুমাত্র সুলতানের ইনার সার্কেল জানতো যে, তিনি ইন্তেকাল করেছেন। অটোমানরা আশঙ্কা করতো যে, সৈন্যরা সুলতানের মৃত্যু সংবাদ শুনতে পেলে লড়াই বন্ধ করে দেবে। তাই ৪৮ দিন তার মৃত্যু সংবাদ গোপন রাখা হয়। উজিরে আজম সুলতানের মৃত্যুর সব সাক্ষীকে হত্যা করেন এবং ঘোষণা করেন, সুলতান এত দুর্বল যে, তিনি দায়িত্ব পালনে সক্ষম নন। সিগেৎভারে তিনি সুস্থ হয়ে উঠছেন। তিনি সুলতানের পক্ষে কাজ করছেন। উজিরে আজম সিগেৎভার দখলে সম্পৃক্তদের পুরস্কৃত এবং সৈন্যদের বেতন বৃদ্ধি করেন। তিনি সৈন্যবাহিনীর একটি অংশকে বাবোকসা দখলে পাঠান। তাতাররা সুলতানের মৃত্যুর সংবাদ ফাঁস করে দেয়। উজিরে আজমের ভাতিজা সকোল্লু মোস্তফা বে চিঠি লিখে সোলেমানের উত্তরসূরি শাহজাদা দ্বিতীয় সেলিমকে তার পিতার মৃত্যু সংবাদ অবহিত করার উদ্যোগ নেন। সুলতানের তাঁবু থেকে তিনি একটি চিঠি দিয়ে একজন বার্তাবাহক পাঠান। ৮ দিনের মধ্যে বার্তাবাহক দূরবর্তী এশিয়া মাইনরে পৌঁছে। তবে বার্তাবাহক চিঠির বিষয়বস্তু সম্পর্কে ছিল অজ্ঞ। সেলিম অবিলম্বে স্রেমস্কা যাত্রা করেন। ভুকোভারে এসে পৌঁছলে মোস্তফা তার কাছে একটি বার্তা হস্তান্তর করেন। বার্তায় তিনি তাকে সৈন্যবাহিনীকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিনন্দন জানাতে এবং কার্যকরভাবে সাম্রাজ্যের দায়িত্ব গ্রহণে বেলগ্রেডে যাবার অনুরোধ করেন। সেলিম বেলগ্রেডে ফিরে যান এবং উজিরে আজম সৈন্যবাহিনীকে সেখানে যাবার নির্দেশ দেন। 
    ১৫৬৬ সালের অক্টোবরে সৈন্যবাহিনী বেলগ্রেড অভিমুখে যাত্রা করে। সুলতানের মৃত্যুর ৪৮ দিন পর উজিরে আজম আনুষ্ঠানিকভাবে তার মৃত্যু সংবাদ ঘোষণা করেন। পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করার সময় তিনি সুলতানের লাশে সুগন্ধি মাখান এবং সৈন্যবাহিনীকে নয়া সুলতানের সাথে সাক্ষাতে বেলগ্রেডে অগ্রযাত্রা করার নির্দেশ দেন। সুলতান সোলেমানকে কন্সটান্টিনোপলে সোলাইমানিয়া মসজিদে স্ত্রী হুররমের মাজারের পাশে সমাহিত করা হয়। পিতার দাফনে নয়া সুলতান সেলিম উপস্থিত হতে পারেননি। তিনবার যাত্রাবিরতির পর সৈন্যবাহিনী স্রেমস্কা মিট্রোভিচায় পৌঁছে। উজিরে আজম নয়া সুলতান দ্বিতীয় সেলিমকে উজির, পাশা ও সৈন্যবাহিনীকে উপঢৌকন দেয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। কিন্তু নয়া সুলতানের উপদেষ্টারা তাকে বারণ করেন। উজিরে আজম বেলগ্রেডে যান এবং সুলতান হিসেবে দ্বিতীয় সেলিমের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। সেলিম তাকে উজিরে আজম হিসেবে বহাল রাখেন। রাজধানীতে সৈন্যবাহিনীর মধ্যে বিদ্রোহের আশঙ্কায় উজিরে আজম পাশা, জেনিসারি ও অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সুলতানের লাশ কন্সটান্টিনোপলে পাঠান। বেলগ্রেডে সুলতান দ্বিতীয় সেলিম একটি বৈঠক আহক্ষান করেন। বেলগ্রেডে অবস্থানের পঞ্চম দিন সুলতান, উজিরে আজম ও সৈন্যবাহিনী কন্সটান্টিনোপলের উদ্দেশে রওনা দেয়। রাজধানীতে পৌঁছার আগে একটি বিদ্রোহ দেখা দেয় এবং শহরের রাস্তা অবরোধ করা হয়। সেলিম তার প্রথম পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। উজিরে আজম সকোল্লু মেহমেদ পাশা যতটুকু ধারণা করেছিলেন, সেলিম নিজেকে তার চেয়ে দুর্বলতর হিসেবে প্রমাণ করেন। অসংখ্য জেনিসারি অতিরিক্ত বেতনের দাবিতে সরাইয়ে তাকে অবরোধ করে। সেলিম তার তাঁবুতে আশ্রয় নেন এবং দাবি দাওয়া মনে নিতে সকোল্লু মেহমেদ পাশাকে নির্দেশ দেন। সকোল্লু ও আহমদ পাশা ঘুষ দিয়ে শহরের পথ মুক্ত করেন। সুলতান জেনিসারিদের সন্তোষজনক উপঢৌকন ও উচ্চ বেতন প্রদানের প্রতিশ্র“তি দিলে শৃঙ্খলা ফিরে আসে। পরদিন প্রত্যেক জেনিসারিকে নগদ ৪০ ডুকাট (স্বর্ণমুদ্রা) এবং বোনাস হিসেবে আরো অতিরিক্ত ২০ ডুকাট দেয়া হয়। শিগগির সামরিক বাহিনীর অন্যান্য শাখা সিপাহী ও অনিয়মিত সৈন্যরা উচ্চ বেতন দাবি করে। সুলতান সেলিম তাদের গ্রেফতার করেন এবং তাদের স্থলে অন্যদের নিয়োগ দেন।       
 
চূড়ান্ত লড়াই 
সুলতান সোলেমানের মৃত্যুর পরদিন ১৫৬৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত লড়াই শুরু হয়। ইতিমধ্যে বিস্ফোরক ও জ্বালানি কাঠ দিয়ে দুর্গের প্রাচীর ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছিল। সকালে ক্ষুদ্রাস্ত্র থেকে অবিরাম গুলিবর্ষণ, গ্রীক ফায়ার ও কামানের সমন্বিত গোলাবর্ষণের মধ্য দিয়ে সর্বাত্মক হামলা শুরু হয়। শিগগির সিগেৎভার দুর্গে আগুন ধরে যায় এবং কাউন্ট জিরিনস্কির প্রাসাদে ছাইভস্ম পতিত হয়। অটোমান সৈন্যরা রণদামামা বাজিয়ে চিৎকার দিয়ে পঙ্গপালের মতো শহরে প্রবেশ করে। কাউন্ট জিরিনস্কি শেষ লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হন এবং তার সৈন্যদের উদ্দেশে বলেন: 
    চলো আমরা এ জ্বলন্ত প্রাসাদ থেকে বের হয়ে খোলা জায়গায় গিয়ে আমাদের শত্র“দের মোকাবিলা করি। যে মৃত্যুবরণ করবে, সে ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভ করবে। যে লড়াই করে বেঁচে থাকবে, বীর হিসেবে তার নাম সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে। আমি প্রথমে এগিয়ে যাবো। আমি যা করবো, তোমরাও তাই করবে। ঈশ্বর সাক্ষী, হে আমার ভাই ও নাইটরা, আমি কখনো তোমাদের ছেড়ে যাবো না। 
    নিকোলা সুবিচ জিরিনস্কি একটি গোপন অভিসন্ধি থেকে দুর্গে চূড়ান্ত লড়াইয়ের অনুমতি দেননি। একটি সংকীর্ণ সেতু দিয়ে অটোমানরা এগিয়ে আসার চেষ্টা করলে প্রতিরোধকারীরা আকস্মিকভাবে প্রবেশদ্বার খুলে দেয় এবং ভাঙ্গা লোহা বোঝাই মর্টারের একটি বিশাল গোলা ছুঁড়ে। এতে ৬০০ অটোমান সৈন্য নিহত হয়। জিরিনস্কি আক্রমণের নির্দেশ দেন এবং তার অবশিষ্ট ৬০০ সৈন্য নিয়ে দুর্গ থেকে বের হয়ে যান। জিরিনস্কির বুকে মাস্কেটের দুটি গুলি লাগে এবং পরে মাথায় তীরবিদ্ধ হলে তিনি শিগগির নিহত হন। তার কিছু সৈন্য দুর্গে পিছু হটে। অটোমানরা দুর্গ দখল করে এবং অধিকাংশ প্রতিরোধকারীকে হত্যা করে। জেনিসারিরা কয়েকজন প্রতিরোধকারীকে রেহাই দেয়। জেনিসারিরা তাদের বীরত্বের প্রশংসা করে। অটোমানদের বেষ্টনী ভেদ করে মাত্র ৭ জন প্রতিরোধকারী পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। জিরিনস্কির শিরñেদ করা হয় এবং তার মাথা নয়া সুলতানের কাছে পাঠানো হয়। একজন তুর্কি সম্মানের সাথে তার দেহ সমাধিস্থ করে। এই তুর্কি একসময় জিরিনস্কির কাছে বন্দি ছিল। ২০১৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সিগেৎভার দুর্গ অবরোধের ৪৫০তম বার্ষিকীতে ক্রোয়েশিয়ার মেদিমুরজি কাউন্টি জাদুঘরে জিরিনস্কির তরবারি ও শিরস্ত্রাণ প্রদর্শন করা হয়।  
                                                                                                                    
গোলাবারুদের ম্যাগাজিনে বিস্ফোরণ 
দুর্গ থেকে শেষ বার বের হয়ে যাবার চেষ্টায় নেতৃত্ব দেয়ার আগে জিরিনস্কি গোলাবারুদে ফিউজ জ্বালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। শেষ প্রতিরোধকারীদের নির্মূল করে দিয়ে অটোমানরা সিগেৎভারের অবশিষ্টাংশে পা রাখে এবং চোরাফাঁদে আটকা পড়ে। দুর্গের গোলাবারুদের ম্যাগাজিনে বিস্ফোরণ ঘটলে হাজার হাজার সৈন্য নিহত হয়। জিরিনস্কির একজন কর্মচারি উজিরে আজম সকোল্লু মেহমেদ পাশার প্রাণ রক্ষা করে। উজিরে আজম ও তার সৈন্যরা দুর্গে সম্পদের খোঁজ এবং জীবিতদের জিজ্ঞাসাবাদ করার সময় এই কর্মচারি তাকে চোরাফাঁদ সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়। সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করার সময় এ বন্দি জবাব দেয় যে, সম্পদ নিঃশেষ হয়ে গেছে। তবে তাদের পায়ের নিচে তিন হাজার পাউন্ড বারুদ আছে এবং বারুদের সাথে একটি দিয়াশলাই যুক্ত। উজিরে আজম সকোল্লু মেহমেদ পাশা ও তার অশ্বারোহী সৈন্যরা ত্বরিতগতিতে পালিয়ে যান। তবে বিস্ফোরণে তিন হাজার অটোমান সৈন্য নিহত হয়। 

ফলাফল 
চূড়ান্ত লড়াইয়ের পর জিরিনস্কির প্রায় সব সৈন্য নিহত হয়। অটোমান সৈন্য নিহত হওয়ার সংখ্যা ছিল ব্যাপক। লড়াইয়ে তিনজন পাশা, ৭ হাজার জেনিসারি এবং ২৮ হাজার সাধারণ সৈন্য প্রাণ হারায়। বিভিন্ন সূত্র অটোমান সৈন্য নিহত হওয়ার সংখ্যা ২০ থেকে ৩০ হাজারের মধ্যে উল্লেখ করছে। লড়াইয়ের পর উজিরে আজম সকোল্লু মেহমেদ পাশা সুলতানের নামে বিজয় ঘোষণা করেন। ঘোষণায় বলা হয়, সুলতানের বর্তমান ভগ্নস্বাস্থ্য তাকে এ সফল অভিযান অব্যাহত রাখতে দিচ্ছে না। তার লাশ কন্সটান্টিনোপলে স্থানান্তর করা হয়। তবে ইনার সার্কেলের কর্মকর্তারা তার সাথে যোগাযোগ রাখার ভান করছিলেন। তুর্কি সূত্র জানায়, তিন সপ্তাহ লুকোচুরি করা হয়। এমনকি সুলতানের ব্যক্তিগত চিকিৎসককে সতর্কতা হিসেবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। দীর্ঘ পথযাত্রা এবং অবরোধে সুলতানের স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হয়। সুলতানের মৃত্যু হওয়ায় অগ্রযাত্রা সমাপ্ত হয়। 
সূএঃ ইন্টারনেট

সৈয়দ আহমদ ব্রেলভীর শিখ বিরোধী জেহাদ

সৈয়দ আহমদ ব্রেলভী ১৮৩১ সালে শিখ বিরোধী জেহাদে বর্তমান পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের বালাকোটে শহীদ হন। ভারতের উত্তর প্রদেশের রায়বেরিলীতে তার জন্ম। তিনি হলেন তরিকা-ই-মোহাম্মদিয়ার অন্যতম নেতা। তাকে ভারতে ওয়াহাবী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গণ্য করা হয়। অনুসারীরা তাকে আমিরুল মোমেনীন খেতাবে ভূষিত করেছিল। পাঞ্জাবে শিখদের হাতে নির্যাতিত মুসলমানরা সহায়তার জন্য সৈয়দ আহমদ ব্রেলভীকে অনুরোধ করে। এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি নিপীড়নমূলক শিখ শাসনের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেন। তিনি শাহ ওয়ালিউল্লাহর পুত্র শাহ আবদুল আজিজের চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়েছিলেন। 
    ১৮৩৯ সালে শিখ রাজা রনজিৎ সিংয়ের মৃত্যুর পর পেশোয়ার শহরে তরিকা-ই-মোহাম্মদিয়ার নিয়ন্ত্রণ কায়েম হয়। বৈরি স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় শিখরা তাকে আটক করে এবং কয়েক শো অনুসারীসহ হত্যা করে। সৈয়দ আহমদ ব্রেলভীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পেশোয়ারে তার ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়। রায়বেরিলীতে বসবাস করায় তিনি সৈয়দ আহমদ বেরেলভী বা ব্রেলভী নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ১৮২৬ সালে সৈয়দ আহমদ পেশোয়ার উপত্যকায় এসে পৌঁছলে শিখ বিরোধী মুসলিম প্রতিরোধ আন্দোলন বেগবান হয়ে ওঠে। তার সঙ্গে ছিলেন অগণিত শিষ্য ও নিবেদিত প্রাণ ব্যক্তিগত বন্ধু। ব্রেলভীর আন্দোলন ছিল মূলত ব্রিটিশ বিরোধী। কিন্তু ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীকে অধিক শক্তিশালী দেখতে পেয়ে তিনি পাঞ্জাবের শিখ রাজা রনজিৎ সিংয়ের বিরুদ্ধে তার জেহাদ পরিচালনা করেন। জেহাদ পরিচালনার ক্ষেত্র হিসেবে উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশকে বেছে নেয়ার পেছনে তার একটি যুক্তি ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, সীমান্ত প্রদেশের সব মুসলমান এবং প্রতিবেশি মুসলিম দেশ আফগানিস্তান তাকে নিরংকুশ সমর্থন দেবে। শিখ অধিকৃত কাশ্মীর ছিল তার পরবর্তী লক্ষ্যস্থল। ভারতকে দারুল হরব থেকে দারুল ইসলামে রূপান্তরিত করা ছিল
তার চূড়ান্ত লক্ষ্য। রায় বেরিলীতে দুই স্ত্রী রেখে তিনি  সীমান্ত প্রদেশে অভিবাসন করেন। চিত্রলে ফাতেমা নামে এক মহিলাকে তিনি তৃতীয় স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন। 

প্রাথমিক জীবন 
১৭৮৬ সালে সৈয়দ আহমদ রায়বেরিলীর এক সৈয়দ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে পিতার মৃত্যু হলে তিনি স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় ভর্তি হন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি তার আগ্রহ ছিল কম। খেলাধূলা, শারীরিক অনুশীলন ও জিকিরের প্রতি তার ঝোঁক ছিল। উচ্চশিক্ষা লাভে ১৮ বছর বয়সে তিনি দিল্লির রহমানিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। এ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শাহ ওয়ালিউল্লাহর পুত্র শাহ আবদুল আজিজ। বহু অনুরোধের পর শাহ আবদুল আজিজ সৈয়দ আহমদের বায়াত গ্রহণ করেন এবং তাকে সূফিবাদে দীক্ষাদানে সম্মত হন। তিনি সৈয়দ আহমদকে কাদরিয়া ও নকশবন্দিয়া তরিকার পাঠ দেন। সৈয়দ আহমদের দ্রুত আধ্যাত্মিক অগ্রগতি ঘটে। চার বছর পর শাহ আবদুল আজিজ তাকে ইজাজাত ও খিলাফত দান করেন। ১৭৬২ সালে শাহ ওয়ালিউল্লাহর মৃত্যুর পর পুত্র আবদুল আজিজ তার স্থলাভিষিক্ত হন এবং তিনি তার পিতার ধর্মীয় আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যান। ব্রিটিশরা দিল্লি অভিমুখে ধেয়ে আসতে শুরু করলে তিনি ভারতকে দারুল হরব (دار الحرب ) বা শত্র“ অধিকৃত ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করে জেহাদের ডাক দেন। ১৮০৩ সালে ব্রিটিশ সৈন্যরা দিল্লিতে অগ্রযাত্রা করলে এবং মোগল সম্রাট ব্রিটিশদের ক্রীড়নকে পরিণত হলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে জেহাদ শুরু এবং গৌরবোজ্জ্বল ইসলামী শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহবান জানিয়ে তিনি একটি ফতোয়া জারি করেন।  
        
সামরিক জীবন
২৫ বছর বয়সে সৈয়দ আহমদ একজন অশ্বারোহী হিসেবে নবাব আমির খানের নেতৃত্বে একটি মিলিশিয়া বাহিনীতে যোগদান করেন। আধুনিক যুদ্ধ কৌশল আয়ত্ত এবং ইউরোপীয় অস্ত্রশস্ত্র চালনায় প্রশিক্ষণ গ্রহণে শাহ আবদুল আজিজ তাকে নবাবের মিলিশিয়া বাহিনীতে যোগদানের নির্দেশ দেন। একটি ক্ষুদ্র পরগনার বিনিময়ে আমির খান ব্রিটিশদের সঙ্গে আপোস করায় তিনি ৬ বছর পর মিলিশিয়া বাহিনী ত্যাগ করেন। সৈয়দ আহমদের দৃষ্টিতে আমির খানের এ উদ্যোগ ছিল ভারতে মুসলমানদের বৃহত্তম হুমকির কাছে আত্মসমর্পণ করার শামিল। মিলিশিয়া বাহিনী ছেড়ে সৈয়দ আহমদ দিল্লিতে ফিরে আসেন এবং সাবেক শিক্ষক শাহ আবদুল আজিজের সঙ্গে  সাক্ষাত করেন। সৈয়দ আহমদের ক্যারিশমা ও পরিপক্কতায় শাহ আবদুল আজিজ এত মুগ্ধ হন যে, তিনি তার ভাতিজা শাহ ইসমাইল ও তারা জামাতা মৌলভী আবদুল হাইকে তার হাতে বায়াত গ্রহণের পরামর্শ দেন। এ দু’জন সৈয়দ আহমদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ অনুসারীতে পরিণত হন। শাহ আবদুল আজিজের অনুমোদন লাভ করায় সৈয়দ আহমদের সুনাম ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। হাজার হাজার লোক তার কাছে ছুটে আসে। এমনকি কলকাতায় অগণিত মানুষ তার পা ছুঁয়ে সালাম করে। ১৮২২ সালে সৈয়দ আহমদ হজ পালনে ভারত ত্যাগ করেন। যাত্রাপথে তিনি বহু জায়গায় বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে তিনি জেহাদের চেতনা ছড়িয়ে দেন। দূরদূরান্ত সফরকালে ব্রেলভী মুসলমানদের মধ্যে অমুসলিম সংস্কৃতির চর্চা দেখতে পান। মুসলমানদের হিন্দুদের পূজায় যোগদান করতে দেখে তিনি ব্যথিত হন। মুসলমানদের বিচ্যুতিতে মর্মাহত হলেও তিনি দেখতে পেয়েছিলেন যে, তাদের মূল চেতনা অক্ষত। মক্কায় তিনি তুরস্কের সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বাংলাদেশের হাজী শরিয়তউল্লাহ ও নিসার আলী তিতুমীর ছিলেন তার সমসাময়িক। মক্কায় তাদের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল। তিনি তাদের সূচিত ফরায়েজী আন্দোলনের প্রতি সমর্থন দেন। ১৮২৬ সালে সৌদি আরব থেকে ভারতে ফিরে আসার পথে তিনি বহু বৈঠকে মিলিত হন। এসময় পাঞ্জাব ছিল শিখ রাজা রনজিৎ সিংয়ের নিয়ন্ত্রণে। রনজিৎ সিং উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ পর্যন্ত তার রাজ্যের সীমান্ত সম্প্রসারণ করেন। শিখ শাসনে মুসলমানরা দুর্ভোগের শিকার হয়। পাঞ্জাবে মুসলমানদের সংখ্যা ৬৬ থেকে ৫৫ শতাংশে নেমে আসে। কোনো কোনো জায়গায় আজান দেয়া নিষিদ্ধ ছিল। শিখদের আচরণ ছিল সৈয়দ আহমদের কাছে অসহ্য। তিনি পাঞ্জাব থেকে অমুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে জেহাদ পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নেন। সৈয়দ আহমদ শিখদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মুজাহিদ সংগ্রহে পাঞ্জাব ও উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ সফর করেন। মুজাহিদ বাহিনী গঠনে তিনি শত শত মাইল ভ্রমণ করেন। এমনকি তিনি রাজস্থান, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও আফগানিস্তান পর্যন্ত ভ্রমণ করেন। আফগানিস্তানের আমির দোস্ত মোহাম্মদ খানের সঙ্গে তিনি  সাক্ষাত করেন এবং শিখদের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা প্রতিহত করার জন্য তার কাছে সামরিক ও নগদ অর্থ সহায়তা চান। তিনি শিখদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণায় তার দৃঢ়সংকল্প প্রকাশ করেন। দোস্ত মোহাম্মদ খান তার সঙ্গে একমত পোষণ করেন এবং তাকে সম্ভব সব ধরনের সহায়তা প্রদানের প্রস্তাব দেন। এমনকি তিনি তাকে সহায়তা প্রদানে তার ভাই ও পেশোয়ারে আফগান গভর্নর সুলতান মোহাম্মদ খান ও ইয়ার মোহাম্মদ খানকে চিঠি লিখেন। মোগল সম্রাট দ্বিতীয় আকবর ব্রেলভীর জেহাদে যোগদানের চেতনার প্রতি সমর্থন জানান। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাকরি ছেড়ে অনেকে শিখ বিরোধী জেহাদে যোগ দেয়। গোটা ভারতের মুসলমানরা ব্রেলভীর তহবিলে অর্থ যোগান দেয়। সৈয়দ আহমদ জেহাদের পতাকা উত্তোলন করেন এবং পশতু সম্প্রদায়ের লোকজনকে তার পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ করেন। তিনি দেখতে পান যে, আফগান সৈন্যরা পরস্পরের প্রতি সন্দিহান এবং তার সঙ্গে জেহাদে যোগদানে প্রস্তুত নয়। ১৮২৬ সালে সৈয়দ আহমদ পেশোয়ারের কাছে আকোরা খাটকের সমভূমিতে তার সদরদপ্তর স্থাপন করেন। তিনি রাজা রনজিৎ সিংয়ের কাছে একটি বার্তা পাঠান। বার্তায় তিনি তাকে মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা মেনে নিতে অথবা মুজাহিদদের মোকাবিলা করার চরমপত্র দেন। রনজিৎ সিং চরমপত্র নাকচ করে দিলে সৈয়দ আহমদ আক্রমণ করতে বাধ্য হন। ইউসূফজাই বিদ্রোহ দমনে সহায়তা করার জন্য চার হাজার সৈন্যসহ বুধ সিং সন্ধানওয়ালিয়া আটক অভিমুুখে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু মহারাজা রনজিৎ সিংয়ের নির্দেশে তাকে ইয়ার মোহাম্মদ খান বারাকজাইয়ের কাছ থেকে রাজস্ব সংগ্রহে পেশোয়ার অভিমুখে রওনা দিতে হয়। সিন্ধু নদ অতিক্রম করার পরই সন্ধানওয়ালিয়া প্রথম ব্রেলভীর তৎপরতার কথা জানতে পারেন এবং খায়েরাবাদ দুর্গের কাছে তাঁবু খাটান। রনজিৎ সিং শয্যাগত অবস্থায় একটি বিশাল ইউসূফজাই বাহিনী নিয়ে ব্রেলভীর অগ্রযাত্রার সংবাদ পান। নওশেরা লড়াইয়ে ইউসূফজাইদের সাহস তখনো তার স্মৃতিতে উজ্জ্বল ছিল। এ সংবাদ পেয়ে তিনি সব সৈন্য সমবেত করেন এবং অবিলম্বে তাদেরকে সীমান্তে পাঠান। 
    পেশোয়ার বারাকজাই নামে পরিচিত চার ভাই ইয়ার মোহাম্মদ খান, সুলতান মোহাম্মদ খান, সাঈদ মোহাম্মদ খান ও পীর মোহাম্মদ খান দৃশ্যত শিখদের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করলেও গোপনে গোপনে সৈয়দ আহমদ ব্রেলভীকে সহায়তা করতেন। ব্রেলভী নওশেরা অভিমুখে অগ্রযাত্রা করলে বুধ সিং সন্ধানওয়ালিয়া তার অভিপ্রায় জানতে চান। জবাবে ব্রেলভী জানান, তিনি প্রথমে আটক দুর্গ দখল করবেন এবং পরে সন্ধানওয়ালিয়ার সঙ্গে লড়াই করবেন। ১৮২৬ সালের ২১ ডিসেম্বর তিনি খায়েরাবাদে শিখ দুর্গ অবরোধ করেন। সৈন্য সংখ্যা মুষ্টিমেয় হওয়ায় কিল্লাদার বুধ সিং সন্ধানওয়ালিয়া পিছিয়ে যান। পরবর্তীতে ব্রেলভী হাজরোথিতে শোচনীয়ভাবে শিখদের পরাজিত হন। শিখ গভর্নর সরদার হরি সিং নালওয়া ৮ হাজার সৈন্য নিয়ে নিকটবর্তী চাচে অবস্থান করছিলেন। পরিস্থিতি জানানো হলে তিনি একদিনের মধ্যে খায়েরাবাদে গিয়ে পৌঁছান। সৈয়দ আহমদের বিজয় তাকে একজন সফল সামরিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে এবং তার সঙ্গে জেহাদে যোগদানে অন্যান্য গোত্রকে উৎসাহিত করে। শিগগির তার সৈন্য সংখ্যা দেড় লাখে উন্নীত হয়। তবে এসব সৈন্য ছিল বিভিন্ন গোত্র ও উপজাতির। তাদের মধ্যে শৃঙ্খলাবোধের ঘাটতি ছিল মারাত্মক। অন্যদিকে তাদের প্রতিপক্ষ শিখরা ছিল উন্নত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্রের অধিকারী। অভিযান পরিচালনার কৌশল নিয়ে মুজাহিদদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। শিখরা অনৈসলামিক হিসেবে আখ্যা দিয়ে তাদের মধ্যকার মতবিরোধকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। তারা আরো দাবি করে যে, শাহ ওয়ালিউল্লাহর শিক্ষা গ্রহণ করে সৈয়দ আহমদের অনুচররা মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেয়ার যোগ্যতা হারিয়েছে এবং তারা হলো ওয়াহাবী। তবে মুসলিম নেতৃবৃন্দ শিখদের এ ভ্রান্ত অভিমত মেনে নেননি। 
১৮২৭ সালে সৈয়দ আহমদকে একজন ইমাম হিসেবে মনোনীত করে সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ধর্মীয় ব্যাপারে তার ফয়সালাকে বাধ্যতামূলক বিবেচনা করা হতো এবং তার ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ব মুজাহিদ বাহিনী গঠনে বিভিন্ন মুসলিম গ্র“পগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হতে সহায়তা করে। সৈয়দ আহমদের হুমকি মোকাবিলায় মহারাজা রনজিৎ সিং সেনাপতি কুনওয়ার শের সিং ও ফরাসি ভাড়াটিয়া জেনারেল ভেঞ্চুরাকে পাঠান। সৈয়দ আহমদ ওকারার কাছে আটকে ৩৫ হাজার শিখ সৈন্যের ওপর আক্রমণ চালানোর প্রস্তুতি নেন। তবে তিনি জানতেন না যে, শিখরা ঘুষ দিয়ে পেশোয়ারে নিযুক্ত আফগান গভর্নর ইয়ার মোহাম্মদ খানকে বশ করে ফেলেছে। ইয়ার মোহাম্মদ খান রণাঙ্গন পরিত্যাগ করলে সৈয়দ আহমদের বাহিনী পরাজিত হয়। তিনি কাশ্মীরের কাছে তার সদরদপ্তর স্থানান্তরে বাধ্য হন। পরবর্তীতে মুজাহিদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইয়ার মোহাম্মদ নিহত হলেও তার ভাই সুলতান মোহাম্মদ খান লড়াই অব্যাহত রাখেন। শিখ মহারাজা রনজিৎ সিং তাকে পেশোয়ারের গভর্নর পদে নিযুক্তি দেন। তিনি মহারাজাকে তার নিহত ভাই ইয়ার মোহাম্মদ খানের বিখ্যাত ঘোড়া লেলি উপহার দেন। রনজিৎ সিং দীর্ঘদিন থেকে ঘোড়াটি নিজের অধিকারে নেয়ার চেষ্টা করছিলেন। ইয়ার মোহাম্মদ খান জীবিত থাকাকালে তিনি তাকে ৫০টি ঘোড়া ও অর্থ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইয়ার মোহাম্মদ সম্মত হননি। সেনাপতি কুনওয়ার শের সিং লেলিকে মহারাজা রনজিৎ সিংয়ের সামনে  পেশ করলে তিনি খুশিতে আত্মহারা হয়ে যান।      
 সৈয়দ আহমদ ব্রেলভী এমন একটি চুক্তিতে পৌঁছান যে, ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী খান ও সাধারণ মানুষ তাদের নিজ নিজ এলাকা শাসন করবে। তিনি উসর (উৎপন্ন শস্যের এক-দশমাংশ রাজস্ব) আদায়ের চেষ্টা করেন। তিনি তিনদিনের মধ্যে সকল বিধবা হিন্দু মহিলাকে বিয়ে দেয়ার জন্য চরমপত্র দিয়ে বলেন, নয়তো তাদের আত্মীয় স্বজনদের বাড়িঘর লুট করা হবে। তার এ চরমপত্রের প্রতিবাদে ইফসূফজাই সম্প্রদায়ের বহু লোক তাকে পরিত্যাগ করে। অনিচ্ছুক খানদের ওপর বলপ্রয়োগ করায় হোতি প্রধান সৈয়দ আহমদের প্রতি বৈরি হয়ে ওঠেন। তিনি পেশোয়ারের গভর্নর সুলতান মোহাম্মদের সঙ্গে একটি শক্তিশালী জোট গঠন করেন। এ জোট পরাজিত হলে ইসলামী সংস্কারবাদীরা চূড়ান্তভাবে পেশোয়ার দখল করে নেয়। ১৮৩০ সালে কয়েক মাস সৈয়দ আহমদ ব্রেলভী প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতাসীন নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আপোস করার চেষ্টা করেন। ১৮৩০ সাল শেষ হওয়ার আগে একটি পরিকল্পিত অভ্যুত্থান ঘটে এবং পেশোয়ার ও সমভূমিতে সৈয়দ আহমদ ব্রেলভীর অনুচরদের হত্যা করা হয়। মুসলমানদের বিরুদ্ধে অব্যাহত আত্মঘাতি লড়াইয়ে বিতৃষ্ণ হয়ে সৈয়দ আহমদ কাশ্মীর ও হাজারা মুক্ত করার উদ্দেশ্যে বালাকোটে যান। তিনদিকে পাহাড় পর্বত থাকায় বালাকোটকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। এখানেই সৈয়দ আহমদ জীবনের শেষ যুদ্ধে শাহাদাৎ বরণ করেন। স্থানীয় নেতৃবৃন্দ শিখদের কাছে পাহাড়ের ভেতরের একটি রাস্তার সন্ধান ফাঁস করে দিলে অপ্রস্তুত অবস্থায় তাকে লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়। 
 
২৬ এপ্রিল বন্ধু টঙ্কের নবাবের কাছে ব্রেলভীর চিঠি
আমি পাখলিতে (জায়গার নাম) অবস্থান করছি। এখানকার লোক উষ্ণ আতিথেয়তার সঙ্গে আমাদের অভ্যর্থনা জানিয়েছে এবং তারা আমাদেরকে থাকার জন্য জায়গা দিয়েছে। তারা জেহাদে আমাদেরকে সাহায্য করার প্রতিশ্র“তি দিয়েছে। বর্তমানে আমি বালাকোট শহরে তাঁবু খাটিয়েছি। জায়গাটি কুনার গিরিপথে (নদী)। কাফের সৈন্যরা আমাদের কাছ থেকে খুব বেশি দূরে নয়। বালাকোটের তিনদিকে পাহাড় এবং একদিকে নদী থাকায় আল্লাহর রহমতে কাফেররা আমাদের কাছে পৌঁছতে পারবে না। অবশ্যই আমরা আমাদের নিজেদের উদ্যোগে যুদ্ধ শুরু করতে পারি। আগামী দু’তিন দিনের মধ্যে আমরা যুদ্ধ শুরু করার আশা করছি। আল্লাহর সহায়তায় আমরা বিজয়ী হবো। যুদ্ধে আমরা বিজয়ী হলে কাশ্মীর রাজ্যসহ ঝিলাম নদী বরারব সকল ভূখণ্ড দখল করবো। আমাদের বিজয়ের জন্য দিন রাত আল্লাহর কাছে দোয়া করো।  
বালাকোটের যুদ্ধ 
শিখ গভর্নর হরি সিং নালওয়া বালাকোট অবরোধে নেতৃত্ব দেন। তার সঙ্গে ছিলেন ফরাসি ভাড়াটিয়া জেনারেল জ্যা ফ্রাঁসোয়া অ্যালার্ড। হরি সিং বালাকোট ঘেরাও এবং মোজাফফরাবাদে খালসা বাহিনীর একটি ব্যাটালিয়ন পাঠাতে ক্যাপ্টেন শের সিংকে নির্দেশ দেন। লাহোর থেকে অতিরিক্ত সৈন্য এসে পৌঁছানো নাগাদ তিনি আটকে অবস্থান করেন। তিনি জানতে পারেন যে, সৈয়দ আহমদ ব্রেলভীর সঙ্গে মুজাহিদের সংখ্যা কয়েক হাজার। মিত্তি কোট পাহাড় ঘেরাওয়ে আরো কয়েকটি শিখ কোম্পানি অংশগ্রহণ করেছিল। ১৮৩১ সালের ৬ মে শুক্রবার সকালে আকস্মিকভাবে বালাকোটের যুদ্ধ শুরু হয়। সেদিনের সকালের একটি তুচ্ছ ঘটনা থেকে যুদ্ধ বেধে যায়। মুজাহিদদের তখনো নাস্তা শেষ হয়নি। মিত্তি কোট পাহাড় থেকে শত্র“ শিখদের গতিবিধির প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছিল। এসময় পাতিয়ালার সৈয়দ চেরাগ আলী ক্ষীর খাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। সকালের মেন্যুতে ক্ষীর না থাকায় তিনি প্রয়োজনীয় সাজসরঞ্জাম সংগ্রহ করে ক্ষীর পাক করতে শুরু করেন। একদিকে তিনি পাতিলে হাতা দিয়ে নাড়ছিলেন এবং অন্যদিকে শিখদের প্রতি উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে খেয়াল রাখছিলেন। এসময় কাউকে তার দিকে এগিয়ে আসতে দেখে তিনি বলে উঠলেন: আমি লাল পোশাক পরিহিত একজন হুর দেখতে পাচ্ছি। সে আমাকে ডাকছে। এই বলে তিনি হাতা ফেলে দিয়ে বললেন, তিনি একমাত্র হুরের হাত থেকে ক্ষীর খাবেন। চেরাগ আলী সোজা পাহাড়ে ছুটে যান। ঘটনাটি এত দ্রুত ঘটে যায় যে, কেউ কিছু বুঝতে পারেনি। ততক্ষণে চেরাগ আলী ধানখেতের মাঝে। তিনি কাদা মাড়িয়ে দৌড়াচ্ছিলেন। শিখরা দৃশ্যটি কিছুটা উপভোগ করে এবং রাইফেল দিয়ে ধানখেতের কাদায় গুলি করে তাকে হত্যা করে। সৈয়দ চেরাগ আলী হলেন বালাকোট যুদ্ধের প্রথম শহীদ। তার বোকামীর জন্য বালাকোটে উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ মুজাহিদ সৈয়দ আহমদ ব্রেলভীসহ কয়েক শত অকুতোভয় মুসলিম যোদ্ধাকে শহীদ হতে হয়। সৈয়দ চেরাগ আলী যাকে দেখছিলেন সে ছিল একজন শিখ সৈন্য। এসব শিখ সৈন্য মুজাহিদদের ওপর নজরদারি করছিল। অনিয়ন্ত্রিত আবেগে উচ্ছ্বসিত চেরাগ আলী কাদায় পূর্ণ ধানখেতের মধ্য দিয়ে সামনে ছুটে যান। এ ধানখেত ছিল শিখদের জন্য সৈয়দ আহমদ ব্রেলভীর পাতা একটি ফাঁদ। তিনি ধারণা করছিলেন যে, শিখরা পাহাড়ের চূড়া থেকে মিত্তি কোটে নেমে এসে মুজাহিদদের ওপর আক্রমণ চালাবে। এ ধারণা থেকে তিনি বালাকোট শহর ও মিত্তি কোট পাহাড়ের মধ্যকার ধানখেত পানিয়ে সয়লাব করে দেন। তিনি ভাবছিলেন আক্রমণকারী শিখরা কাদায় আটকা পড়বে এবং মুজাহিদরা হাঁসের মতো ধরে তাদের যমালয়ে পাঠাবে। অন্যদিকে শিখদের পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন। তারা তাদের অবস্থানে অনড় থাকে। শিখরা চাইছিল মুজাহিদরা আগে হামলা করুক।      
গুলিতে মারাত্মক বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে। সৈয়দ আহমদ ব্রেলভী তার ইতিপূর্বের পরিকল্পনা পরিত্যাগ করেন এবং  শিখদের ওপর আক্রমণ চালাতে তার অনুসারীদের নির্দেশ দেন। মুজাহিদরা সামনে ছুটে যায় এবং ধানখেতের কাদায় আটকা পড়ে। একইসঙ্গে শিখরাও এগিয়ে আসে। মুজাহিদদের আল্লাহু আকবর এবং শিখদের ওহে গুরুজি কি ফাতেহ ধ্বনির মধ্য দিয়ে সারাদিন তীব্র লড়াই অব্যাহত থাকে। শিখ গোলন্দাজ বাহিনী দু’ঘণ্টা কামানের গোলাবর্ষণ করে। বিপর্যয়ের মুখে সৈয়দ আহমদ ব্রেলভী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যান। শিখরা পরাজিত মুজাহিদদের ৬ মাইল পর্যন্ত ধাওয়া করে তাদের সকল কামান, সুইভেল গান, উট ও রসদ দখল করে। ঢাক ঢোল পিটিয়ে ও গোলা ছুঁড়ে লাহোরে এ বিজয় উদযাপন করা হয়। ধরা পড়লে সৈয়দ আহমদ ব্রেলভী ও তার কমান্ডার শাহ ইসমাইলসহ বহু মুজাহিদকে শহীদ করা হয়। বালাকোটে তাদের সমাহিত করা হয়। সেখানে তাদের সম্মানে মাজার নির্মাণ করা হয়। ব্রেলভীর পরিবার টঙ্কের নবাবের কাছে আশ্রয় গ্রহণ করে। শাহাদাৎ বরণের সময় ব্রেলভীর বয়স হয়েছিল ৪৬ বছর।  
 প্রায় দুই শো বছর পর ২০০৫ সালের ৬ অক্টোবর ৭ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্পে বালাকোট শহর মাটির সঙ্গে মিশে গেলেও অলৌকিকভাবে সৈয়দ আহমদ ব্রেলভী ও শাহ ইসমাইলের কবর ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়। শহীদ মুজাহিদদের সংখ্যা তিন শো থেকে এক হাজার তিন শো পর্যন্ত উল্লেখ করা হচ্ছে। বালাকোট যুদ্ধে মুজাহিদদের পরাজয় ছিল জেহাদের জন্য একটি গুরুতর বিপর্যয়। ১৮৬৩ সাল পর্যন্ত উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের পাহাড়ে এ আন্দোলন অব্যাহত ছিল। মুজাহিদদের হুমকি মোকাবিলায় ব্রিটিশরা একটি শক্তিশালী সৈন্যবাহিনী পাঠায়। এই প্রথম ভারতের ইতিহাসে অত্যাচারী অমুসলিম শাসকের নির্যাতন থেকে মুসলমানদের মুক্তিদানে জেহাদ পরিচালনা করা হয়। পাটনা ছিল এ আন্দোলনের সদরদপ্তর। ঢাকা থেকে পেশোয়ার পর্যন্ত ছিল তাদের নেটওয়ার্ক। এ সংগঠনের ভিত্তি ও ক্ষমতা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে সতীশ চন্দ্র মিত্তাল হরিয়ানা :: অ্যা হিস্ট্রিক্যাল পারস্পেক্টিভ শিরোনামে গ্রন্থের ৬৫ নম্বর পৃষ্ঠায় লিখেছেন : Probably this was the first planned and highly organised revolutionary movement after the uprising of 1857. অর্থাৎ ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ ছাড়া এটাই ছিল সম্ভবত প্রথম পরিকল্পিত ও অত্যন্ত সংঘটিত বৈপ্লবিক আন্দোলন।   

গাধার অলৌকিক গুণ
বালাকোটে যাবার পথে মুজাহিদরা বর্তমান এবোটাবাদের কাছে কোথাও তাঁবু খাটায়। তাদের সরবরাহ পথ বিচ্ছিন্ন করে দিতে শিখরা রাস্তার পাশের পাহাড়ের শীর্ষে সৈন্য মোতায়েন করে। পাহাড়ের মধ্য দিয়ে বহর পাঠানো ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় মুজাহিদরা চালক ছাড়া একটি গাধা যোগাড় করে। গাধা একবার কোনো রাস্তা পারাপার হলে চিরদিন স্মরণ রাখতে পারে। চালকের প্রয়োজন পড়ে না। মাল বোঝাই করে পাছায় একটি টোকা দিলেও হলো। গাধার এ অলৌকিক গুণের কথা শিখদের জানা না থাকায় সে রাত দিন রসদ নিয়ে আসা যাওয়া করতো। বুঝতে শিখদের অনেক সময় লাগে। একরাতে মাল বহনের সময় শিখরা তাকে গুলি করে হত্যা করে। মুজাহিদরা তার মৃত্যুতে ব্যথিত হয় এবং একটি কবরে সম্মানের সঙ্গে তাকে সমাহিত করে। গাধার কবর খোটা কবর নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। 
(লেখাটি ‘মোগল সাম্রাজ্যের পতন’ থেকে নেয়া। বইটি প্রকাশ করেছে আফসার ব্রাদার্স)।

নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের ক্ষমতা ও রায় নিয়ে বিতর্ক

নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের ক্ষমতা ও রায় নিয়ে বিতর্ক
 
নাৎসি জার্মানির আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেমে গেলেও মানবজাতি এখনো এ যুদ্ধের স্মৃতি ভুলতে পারেনি। পরাজিত জার্মানির সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বিচারে নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। কিন্তু ট্রাইব্যুনালের ক্ষমতা ও তাদের রায় তখন থেকেই বিতর্কের একটি বিষয়বস্তু। নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল বিশ্বের জন্য বিপজ্জনক নজির স্থাপন স্থাপন করেছে। এ ট্রাইব্যুনাল বিচারে দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করেছে। 
  ১৯৩৯ সালে জার্মানির পাশাপাশি সোভিয়েত ইউনিয়নও পোল্যান্ডে আগ্রাসন চালায়। পোল্যান্ডে আগ্রাসন চালানোর অপরাধে জার্মান ফিল্ড মার্শাল উইলিয়াম কিটেল, জেনারেল জোডল ও জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী রন রিবেনট্রপকে অভিযুক্ত করা হয়। কিন্তু একই অপরাধে সোভিয়েত ইউনিয়নের কারো বিচার হয়নি। ১৯৩৯ সালে দুটি দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত অনাক্রমণ চুক্তির আওতায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও জার্মানি তাদের প্রতিবেশি পোল্যান্ড আক্রমণ করে। নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল ১৯৩৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে জার্মানির অনাক্রমণ চুক্তিকে ‘জাল’ হিসেবে উল্লেখ করে। শুধু তাই নয়, ইরানে অ্যাংলো-সোভিয়েত আগ্রাসন এবং উইন্টার ওয়ার বা ফিনল্যান্ডে -সোভিয়েত অভিযানকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়নি। এসব ক্রটি থাকায় যুুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতি হারলাক ফিস্কে স্টোন নুরেমবার্গ ট্রায়ালকে একটি প্রতারণা হিসেবে আখ্যা দেন।       
  আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে যত যুদ্ধ হয়েছে তার মধ্যে ভয়াবহতার দিক থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে অন্য কোনো যুদ্ধের তুলনা নেই। এ যুদ্ধকে কেন্দ্র করে পৃথিবী দু’টি সামরিক শিবিরে বিভক্ত হয়ে যায়। একদিকে ছিল জার্মানির নেতৃত্বে অক্ষশক্তি এবং আরেকদিকে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে মিত্রপক্ষ ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। অক্ষশক্তিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে জার্মানি ছাড়া ছিল ইতালি, জাপান ও তুরস্ক। মিত্রপক্ষে ছিল যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও অস্ট্রেলিয়াসহ ব্রিটিশ কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলো। ১৯৩৯ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর যুদ্ধ শুরু হয় এবং শেষ হয় ১৯৪৫ সালের ৮ মে। যুদ্ধে অক্ষশক্তি পরাজিত হয়ে মিত্রপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করে। অকল্পনীয় নির্যাতনের ভয়ে নাৎসি জার্মানির চ্যান্সেলর ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নায়ক এডলফ হিটলার আত্মহত্যা করেন। বিজয়ী মিত্রপক্ষ তার দেশকে দু’ভাগে বিভক্ত করে ফেলে। আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম জার্মানি নামে পুঁজিবাদী একটি দেশ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে পূর্ব জার্মানি নামে সমাজতান্ত্রিক আরেকটি দেশ আত্মপ্রকাশ করে। জাপানকে ভৌগোলিকভাবে বিভক্ত করা হয়নি একথা সত্যি। কিন্তু দেশটিকে দীর্ঘদিন আমেরিকার দখলদারিত্বের আওতায় কাটাতে হয়েছে। পরাজিত হলে কী নির্মম যাতনা সহ্য করতে হয় জার্মানি ও জাপান হলো তার জ্বলন্ত প্রমাণ।          

  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান খুব সামান্য। আমাদের মধ্যে অনেককে যুদ্ধাপরাধ ও যুদ্ধের নৃশংসতা নিয়ে প্রায়ই আলোচনা করতে দেখা যায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, যত দোষ সব অক্ষশক্তি বা জার্মানির ঘাড়ে ঢেলে দিয়ে সবাই আলোচনা শেষ করেন। কারো আলোচনায় যুদ্ধের নিরপেক্ষ চিত্র ফুটে উঠে না। বন্দি শিবিরে জার্মানদের নির্যাতন, ইহুদী নিধন হলোকাস্ট, জাতিগত শুদ্ধি অভিযান এবং পূর্ব রণাঙ্গনে রুশ বন্দিদের সঙ্গে অমানবিক আচরণের উপাখ্যান অনেকেরই জানা। এসব ঘটনা যুদ্ধের একটি পৃষ্ঠা। কিন্তু অন্য পৃষ্ঠার ঘটনাবলী অনেকের কাছেই অজ্ঞাত। যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ মিত্রশক্তি আন্তর্জাতিকভাবে এমন একটি অপ্রতিহত অবস্থানে পৌঁছে যায় যেখানে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো সম্ভব ছিল না এবং এখনো সম্ভব নয়। সুবিধাজনক অবস্থানে থাকায় মিত্রশক্তি পরাজিত দেশগুলোর যুদ্ধাপরাধের সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং তাদের বিচার করে। নুরেমবার্গ ট্রায়াল বিচারের নামে বিশ্বে এমন এক বিপজ্জনক নজির স্থাপন করেছে যে, পরবর্তীকালে বহু বিজয়ী শক্তি তাদের পরাজিত প্রতিপক্ষকে নির্মূলে অনুরূপ প্রহসনসূলক বিচারের আয়োজন করে। ১৯৪৫ সালে পরাজিত জার্মানির সঙ্গে মিত্রবাহিনীর আচরণকে অমানবিক বললেও কম বলা হবে। জার্মানির আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেমে গিয়েছিল সত্যি। কিন্তু একইসঙ্গে শুরু হয়েছিল জার্মানদের নজিরবিহীন দুর্ভোগ। বিজয়ী মিত্রবাহিনী ধ্বংস, লুটতরাজ, দুর্ভিক্ষ, ধর্ষণ, জাতিগত নির্মূল অভিযান এবং গণহত্যার এক ভয়ংকর যুগের সূচনা ঘটায়। আন্তর্জাতিক টাইম ম্যাগাজিন পরাজিত জার্মানির এ পরিণতিকে ইতিহাসের সবচেয়ে ‘বিভীষিকাময় শান্তি’ হিসাবে আখ্যায়িত করে। অধিকাংশ রাজনীতিবিদ, প-িত, ঐতিহাসিক ও গবেষক ইতিহাসের এ ‘অজ্ঞাত হলোকাস্ট’কে এড়িয়ে যাচ্ছেন।                                                     
   দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে নির্মোহ আলোচনা করলে দেখা যাবে যে, পরাজিত অক্ষশক্তির চেয়ে বিজয়ী মিত্রবাহিনীর অপরাধের সংখ্যা বেশি। যুদ্ধের সবচেয়ে নির্মম ট্র্যাজেডি হলো এটাই যে, বিজয়ীদের তুষ্টি অনুযায়ী ইতিহাস লিখা হয়। ইতিহাসে পরাজিতরা অপরাধী হিসাবে সাব্যস্ত হয়। তাদের পক্ষে কেউ দাঁড়ায় না। তার মানে এই নয় যে, তাদের পক্ষে কোনো কালে কেউ দাঁড়াবে না। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ এন্থনি বীভার, নরম্যান নাইমাক, নিয়েল ফার্গুসান এবং জার্মান ইতিহাসবিদ অনিতা গ্রোসম্যান অত্যন্ত শক্ত পায়ে দাঁড়িয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন। এসব বিবেকবান ঐতিহাসিক মানবজাতির সামনে অজানা অধ্যায় উন্মোচিত করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তি অক্ষশক্তির বেসামরিক লোক ও সৈন্যদের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন নৃশংসতা দেখিয়েছে। তাদের এসব আচরণ যুদ্ধের আইনের সুস্পষ্ট লংঘন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে অক্ষশক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করা হয়। এসব বিচারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নুরেমবার্গ ও টোকিও ট্রায়াল। লন্ডন চার্টারের কর্তৃত্ব বলে এসব আদালত গঠন করা হয়। লন্ডন চার্টারে কেবলমাত্র অক্ষশক্তির যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ বিবেচনা করা হয়। মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বহু অভিযোগ ছিল। এসব অভিযোগ তদন্ত করে অভিযুক্তদের সামরিক আদালতে বিচার করা হয়। কিন্তু এসব বিচার নুরেমবার্গ বা টোকিও ট্রাইব্যুনালের মতো ছিল না। এছাড়া মিত্রশক্তির যুদ্ধাপরাধের কয়েকটি অভিযোগ তদন্ত করা হয়নি। জেনেভা কনভেনশনে যুদ্ধাপরাধের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হলেও যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক আদালতের মানদ- নির্ধারণ করা হয়নি। জেনেভা কনভেনশনে যদি এমন শর্ত থাকতো যে, যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষের নিয়ন্ত্রণ, প্রভাব কিংবা কোনো কর্তৃত্ব থাকবে না তাহলে এত বছর পরও নুরেমবার্গ ও টোকিও ট্রাইব্যুনালের রায় নিয়ে প্রশ্ন উঠতো না। এছাড়া নিজেদের অপরাধ আড়াল করার জন্য মিত্রশক্তি বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপর জেনেভা কনভেনশন থেকে তাদের প্রত্যাহার করে নেয়। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন কখনো জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষর দান করেনি। নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের মানদ- নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ করা হলে আমেরিকান, সোভিয়েত এবং মিত্রপক্ষের বহু সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলতে হতো। পরাজিত হলে জার্মানির প্রতি বিজয়ীদের আচরণ কী হতে পারে সে সম্পর্কে সজাগ থাকায় যুদ্ধের চূড়ান্ত মাসগুলোতে জার্মানরা মরিয়া হয়ে যুদ্ধ অব্যাহত রাখে। যুদ্ধের দু’বছর পর জার্মানির প্রতি আমেরিকা ও ব্রিটিশদের নীতিতে পরিবর্তন আসে। এ দু’টি দেশ জার্মানদের সম্ভাব্য মিত্র হিসেবে ভাবতে শুরু করে এবং তাদের সমর্থন কামনা করে। কোনো মানবিক তাগিদে নয়, সোভিয়েত সম্প্রসারণের ভয়ে পাশ্চাত্যের নীতিতে জার্মানির প্রতি তাদের মনোভাবে বদলে যায়। 
  
নুরেমবার্গ ট্রায়াল
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও হলোকাস্টে জড়িত নাৎসিদের দু’টি পৃথক বিচারের সাধারণ নাম নুরেমবার্গ ট্রায়াল বা নুরেমবার্গ বিচার। ১৯৪৫ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত জার্মানির নুরেমবার্গ শহরে নুরেমবার্গ প্যালেস অব জাস্টিসে এ বিচার অনুষ্ঠিত হয়। এসব বিচারের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত বিচার ছিল আন্তর্জাতিক সামরিক আদালত বা আইএমটিতে মূল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। এ আদালতে নাৎসি জার্মানির ২৪ জন গুরুত্বপূর্ণ নেতার বিচার করা হয়। ১৯৪৫ সালের ২০ নভেম্বর থেকে ১৯৪৬ সালের পহেলা অক্টোবর পর্যন্ত এ বিচার চলে। ১৯৪৫ সালের ৮ আগস্ট ঘোষিত লন্ডন সনদের ভিত্তিতে এ বিচারের আইনগত ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়। লন্ডন সনদে এ বিচার ইউরোপীয় অক্ষ দেশগুলোর মূল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। এ সনদে এটাও উল্লেখ করা হয় যে, আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে মিত্রপক্ষের বিরুদ্ধে উত্থাপিত যুদ্ধাপরাধের বিচার করা হবে না। জার্মানির আত্মসমর্পণের দলিলে বর্ণিত শর্তাবলী ছিল এ আদালতের এখতিয়ারের আইনগত ভিত্তি। আত্মসমর্পণ করায় জার্মানির রাজনৈতিক কর্তৃত্ব এলায়েড কন্ট্রোল কাউন্সিলের কাছে ন্যস্ত হয়। ২৪ জন শীর্ষ জার্মান যুদ্ধবন্দির মধ্যে ২১ জনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তারা হলেন মার্টিন বোরম্যান (নাৎসি দলের সেক্রেটারি), এডমিরাল কার্ল ডোয়েনিৎস (জার্মান নৌবাহিনী প্রধান), হ্যান্স ফ্রাঙ্ক (অধিকৃত পোল্যান্ডে জার্মানির গভর্নর জেনারেল), উইলহেম ফ্রিক (নাৎসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী), হ্যান্স ফ্রিৎজশি (নাৎসি প্রচার মন্ত্রণালয়ের বার্তা বিভাগের প্রধান), ওয়ালথার ফ্রাঙ্ক (অর্থমন্ত্রী), ফিল্ড মার্শাল গোয়েরিং (জার্মান বিমান বাহিনী প্রধান), রুডলফ হেস (জার্মানির ডেপুটি ফুয়েরার), জেনারেল আলফ্রেড জোডল (জার্মান সেনাবাহিনী প্রধান), জেনারেল আর্নেস্ট কার্লটেনব্রুনার (এসএস কমান্ডার), ফিল্ড মার্শাল উইলহেম কিটেল (জার্মান সেনাবাহিনীর কমান্ডো প্রধান), গুস্তাভ ভন বোহলেন (শীর্ষ নাৎসি শিল্পপতি), রবার্ট লে (জার্মান শ্রমিক দলের প্রধান), কন্সটান্টাইন ভন নিউরথ (জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী), ফ্রাঞ্জ ভন পাপেন (হিটলারের আমলে জার্মান উপ-চ্যান্সেলর), এডমিরাল এরিক রিডার (জার্মান নৌবাহিনী প্রধান), ভন রিবেনট্রপ (জার্মান পররাষ্ট্র্রমন্ত্রী), আলফ্রেড রোজেনবার্গ (জার্মান বর্ণবাদী তাত্ত্বিক ও মন্ত্রী), আর্নেস্ট ফ্রেডারিক সাউকেল (জেনারেল প্রোনিপোটেনশিয়ারি), ড. হাজেলমার সাচেৎ (জার্মান ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদ), বালডর ভন শিরাচ (হিটলারের যুব শাখার প্রধান), আর্থার সেচ ইনকুয়ার্ট (অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর), আলবার্ট স্পিয়ার (জার্মান সমরমন্ত্রী), জুলিয়াস স্ট্রেচার (ডার স্টারমারের প্রকাশক ও প্রতিষ্ঠাতা)।
   নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের বিচারক জন জে. পার্কার ও ফ্রান্সিস বিডল ছিলেন আমেরিকান, লে. কর্নেল আলেক্সান্ডার ভোলচকোভ ও মেজর জেনারেল আইয়নো নিকিৎচেনকো ছিলেন সোভিয়েত, কর্নেল স্যার জিওফ্রে লরেন্স ও নরম্যান বিরকেট ছিলেন ব্রিটিশ, অধ্যাপক হেনরি দনিদিউ দ্য ভাবরেজ ও রবার্ট ফলকো ছিলেন ফরাসি। নুরেমবার্গ ট্রায়ালে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে মুখ্য কৌঁসুলি ছিলেন রবার্ট এইচ. জ্যাকসন, ব্রিটেনের পক্ষে হার্টলি শক্রুজ, সোভিয়েত রাশিয়ার পক্ষে জেনারেল আরএ রুদেনকো এবং ফ্রান্সের পক্ষে ফ্রাঙ্কো দ্য মেনন ও অগাস্টি শাম্পি টিয়ার দ্য রিবেস।
   বিবাদীদের আপিল করার সুযোগ ছিল না। এ ছাড়া বিচারক নিয়োগে তাদের আপত্তি করাও সম্ভব ছিল না। এসব ত্রুটি ও অসঙ্গতি থাকায় বিভিন্ন গ্রুপ ও ব্যক্তি এ ট্রাইব্যুনাল গঠনের  বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কেউ কেউ বলছেন, বিজয়ী শক্তি বিচারক নিয়োগ করায় এ ট্রাইব্যুনাল নিরপেক্ষ ছিল না এবং প্রকৃত বিবেচনায় তাকে আদালত হিসাবে গণ্য করা যায় না। নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের নিরপেক্ষতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছিল তা একেবারে অমূলক ছিল না। ১৯৩৬-৩৮ সালে নুরেমবার্গ ট্রায়ালে নিয়োজিত প্রধান সোভিয়েত বিচারক নিকিৎচেনকো মস্কোয় স্টালিনের শো ট্রায়ালে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ফলে নুরেমবার্গ ট্রায়ালের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয়। পূর্বে কৃত অপরাধের ভিত্তিতে বিবাদীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। কোনো নির্দিষ্ট দেশের নিজস্ব আইনে এসব অভিযোগ আনা হয়নি। বিবাদী পক্ষের কোনো আইনজীবী ছিল না। আদালতে একচেটিয়া ছিল বিজয়ী মিত্রশক্তির প্রতিনিধিত্ব। আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইব্যুনাল গঠন সংক্রান্ত সনদের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল: ‘এ আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণে টেকনিক্যাল রীতিনীতি মানতে বাধ্য নয়।’ এতে আরো বলা হয়েছিল: ‘এ আদালত রায়দানে যতদূর সম্ভব নিজস্ব বিচারবুুদ্ধি ও নন-টেকনিক্যাল পদ্ধতি অনুসরণ করবে এবং প্রয়োজনীয় বলে বিবেচনা করলে যে কারো সাক্ষ্য গ্রহণ করতে পারবে।’

বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের পরতে পরতে ছিল ক্রটি। বিচার প্রক্রিয়ার সর্বত্র ছিল ধোঁকা ও প্রতারণা। আমেরিকানরা যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত জার্মানদের নৃশংসতার একটি প্রামাণ্য চিত্র বিবাদীদের দেখতে বাধ্য করে। এ প্রামাণ্য চিত্রে প্রতারণা করে জার্মান শহর ও শিল্প কারখানায় মিত্রবাহিনীর ভয়াবহ বোমাবর্ষণে নিহতদের ছবিও সংযোজন করা হয়। কয়েকজন জার্মানের কাছে প্রতারণা ধরা পড়ে। জার্মান বিমান বাহিনীর একজন সাবেক কর্মকর্র্তা বলেছিলেন: ‘তিনি প্রামাণ্য চিত্রে তার নিজের ছবি দেখতে  পাচ্ছেন।’ আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা ‘ওএসএস’ (সিআইএর পূর্বসূরি) চাইছিল সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা এনকেভিডি স্টাইলে প্রহসনের বিচারে গুলি করে হত্যার বিচার। এ নিয়ে ওএসএস প্রধান ‘ওয়াইল্ড বিল’ ডানোভানের সঙ্গে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের এসোসিয়েট বিচারপতি ও মুখ্য আমেরিকান কৌঁসুলি রবার্ট এইচ. জ্যাকসনের গুরুতর মতপার্থক্য দেখা দেয়। জ্যাকসন তাকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন: If we want to shoot Germans as a matter of policy, let it be done as such, but don’t hide the deed behind the court. If you are determined to execute a man in any case, there is no occasion for a trial; the world yields no respect to courts that are merely organized to convict. It would bring the law into contempt if mock tribunals were held with the verdict already decided.’ 
 অর্থাৎ দনীতিগত কারণে আমরা যদি জার্মানদের গুলি করে হত্যা করতে চাই তাহলে সেভাবেই তা করা হোক। তবে আদালতের ভূমিকাকে আড়াল করবেন না। আপনি যদি কোনো মামলায় কাউকে মৃত্যুদ- দিতে চান তাহলে আদালতের প্রয়োজন নেই। কাউকে অভিযুক্ত করার জন্য আদালত গঠন করা হয়ে থাকলে বিশ্ব এ আদালতকে সম্মান করবে না। পূর্বনির্ধারিত রায়ের ভিত্তিতে প্রহসনের আদালত গঠন করা হলে তা হবে আইনের অবমাননা।’ (সূত্র: নুরেমবার্গ: দ্য লাস্ট ব্যাটল: ডেভিড আরভিং: পৃষ্ঠা নম্বর ১৪) 
   ১৯৪৫ সালের অক্টোবরে এক চিঠিতে নুরেমবার্গ ট্র্রায়ালের ক্রটি নিয়ে প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস. ট্রুম্যানের সঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে মুখ্য মার্কিন কৌঁসুলি রবার্ট জ্যাকসন লিখেছিলেন,That the Allies have done or are doing some of the very things we are prosecuting the Germans for. The French are so violating the Geneva Convention in the treatment of German prisoners of war that our command is taking back prisoners sent to them [for forced labor in France]. We are prosecuting plunder and our Allies are practicing it. We say aggressive war is a crime and one of our allies asserts sovereignty over the Baltic States based on no title except conquest.’ 
  অর্থাৎ ‘জার্মানদের আমরা যেসব অপরাধে বিচার করছি, আমরাও একই ধরনের কিছু অপরাধ করেছি এবং এখনো করছি। ফরাসিরা জার্মান যুদ্ধবন্দিদের প্রতি তাদের আচরণে জেনেভা কনভেনশন এত লংঘন করেছে যে, আমাদের কমান্ড ফ্রান্সের শ্রম শিবিরে প্রেরিত যুদ্ধবন্দিদের ফিরিয়ে আনছে। আমরা লুণ্ঠনের বিচার করছি এবং আমাদের মিত্ররা এ ঘৃণ্য চর্চা করছে। আমরা আগ্রাসী যুদ্ধকে একটি অপরাধ হিসাবে আখ্যায়িত করছি। কিন্তু আমাদের অন্যতম মিত্র (সোভিয়েত ইউনিয়ন) কোনো বৈধতা ছাড়া শুধুমাত্র সামরিক অভিযানের মাধ্যমে বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোতে নিজের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করছে।’   
    রায় ঘোষণার পরপর নুরেমবার্গ ট্রায়ালে জার্মান জেনারেলদের বিচারে সভাপতিত্বকারী আইওয়া সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি চার্লস এফ. ওয়েনার্সট্রাম মন্তব্য করেছিলেন: ‘আজ আমি যা বুঝতে পারছি, ৭ মাস আগে তা বুঝতে পারলে কখনো এখানে আসতাম না। ঘোষণা করা হয়েছিল একটি মহান আদর্শকে সমুন্নত রাখতে এ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। কিন্তু সে আদর্শের প্রতিফলন ঘটেনি।’ তিনি সতর্কতার সঙ্গে নুরেমবার্গ বিচার প্রক্রিয়ায় ব্যাপকভাবে ইহুদী সম্পৃক্ততা উল্লেখ করে বলেন: ‘এখানকার পুরো পরিবেশ অসুস্থ। বিগত কয়েক বছর আগে যেসব ব্যক্তি আমেরিকান হয়েছে তাদেরকে আইনজীবী, ক্লার্ক, দোভাষী ও গবেষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তাদের অতীত ইউরোপের ঘৃণা ও প্রতিহিংসায় ভরপুর। নাৎসি নেতৃবৃন্দের অপরাধ সম্পর্কে জার্মানদের বিশ্বাস অর্জন করা ছিল বিচারের উদ্দেশ্য। কিন্তু বিচারে জার্মানদের শুধু এই ধারণা দেয়া হয়েছে যে, প্রবল শক্তিশালী প্রতিপক্ষের কাছে তাদের নেতৃবৃন্দ যুদ্ধে পরাজিত হয়েছেন।’                
   যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হারল্যান ফিস্কে স্টোন নুরেমবার্গ ট্রায়ালকে একটি প্রতারণা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, Jackson is away conducting his high-grade lynching party in Nuremberg. I don't mind what he does to the Nazis, but I hate to see the pretense that he is running a court and proceeding according to common law. This is a little too sanctimonious a fraud to meet my old-fashioned ideas. 
 অর্থাৎ ‘জ্যাকসন (মুখ্য মার্কিন কৌঁসুলি) নুরেমবার্গে উচ্চ পর্যায়ের ফাঁসি দানে দূরে অবস্থান করছেন। তিনি নাৎসিদের যা করছেন তাতে আমি অসন্তুষ্ট নই। তবে তিনি সাধারণ আইনের ছল ছুঁতায় আদালত ও শুনানি পরিচালনা করায় আমি তাকে ঘৃণা করি। এটা হচ্ছে আমার পুরনো ধারণাকে সত্যি প্রমাণে অতি বকধার্মিক প্রতারণা।’  
  নুরেমবার্গ: দ্য লাস্ট ব্যাটলের রিভিউতে ডানিয়েল ডব্লিউ. মাইকেল লিখেছেন, As Irving shows, the victorious Allies who sat in judgement at Nuremberg were guilty of of many of the same actions or crimes for which they tried (and hanged) the German defendants. Indeed, the Allies very probably outdid the Germans in crimes and atrocities. In some cases, the Nuremberg defendants were charged with or held guilty of crimes that were actually committed by the Allies. Most noteworthy, perhaps, is the massacre of Katyn and elsewhere.’ 
  অর্থাৎ ‘আরভিং দেখিয়েছেন যে, নুরেমবার্গ আদালতে বিচারকের আসনে উপবিষ্ট বিজয়ী মিত্রশক্তি বিবাদী জার্মানদের যেসব অপরাধে বিচার করছেন (ফাঁসি দিয়েছেন), তারা নিজেরাও একই ধরনের বহু কার্যকলাপ অথবা অপরাধে অভিযুক্ত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নুরেমবার্গ ট্রায়াল ঐসব অপরাধে বিবাদীদের দোষী সাব্যস্ত অথবা অভিযুক্ত করেছিল, সত্যিকারভাবে যেসব অপরাধ করেছিল মিত্রপক্ষ। কাতিন এবং অন্যান্য হত্যাযজ্ঞের উদাহরণ সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য।’   
   
টোকিও ট্রাইব্যুনাল 
টোকিও ট্রাইব্যুনালের বৈশিষ্ট্যও ছিল অভিন্ন। টোকিও যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল নামে পরিচিত দূরপ্রাচ্য সংক্রান্ত ট্রায়ালে জাপান সাম্রাজ্যের নেতৃবৃন্দের তিন শ্রেণীর যুদ্ধাপরাধের শাস্তিদানে ১৯৪৬ সালের ২৯ এপ্রিল বিচার শুরু হয়। যুদ্ধ শুরুর যৌথ ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত এবং সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তিদের অপরাধকে ‘এ’ শ্রেণী এবং প্রচলিত এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িতদের অপরাধকে ‘বি’ শ্রেণী এবং পরিকল্পনা, নির্দেশ, অনুমোদন অথবা কমান্ড কাঠামোর সর্বোচ্চ পর্যায়ে গৃহীত অপরাধমূলক সিদ্ধান্তে বাধা দানে ব্যর্থ ব্যক্তিদের অপরাধকে ‘সি’ শ্রেণীভুক্ত করা হয়। ২৮ জন জাপানি সামরিক ও রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে ‘এ’ শ্রেণীর এবং ৫ হাজার ৭ শো জনের বেশি জাপানি নাগরিকের বিরুদ্ধে ‘বি’ ও ‘সি’ শ্রেণীর অভিযোগ আনা হয়। জাপান সম্রাট হিরোহিতো এবং রাজপরিবারের সকল সদস্যকে বিচার থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। ১৯৪৬ সালের ১৯ জানুয়ারি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল ম্যাকআর্থার দূরপ্রাচ্য বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইব্যুনাল (আইএমটিএফই) গঠনের নির্দেশ জারি করেন। একইদিন তিনি আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইব্যুনালের সনদ অনুমোদন করেন। এ সনদে নুরেমবার্গ ট্রায়ালের মডেল অনুসরণ করা হয়। টোকিও ট্রাইব্যুনালের সব ক’জন বিচারক ছিলেন বিদেশি। স্যার উইলিয়াম ওয়েব ট্রাইব্যুনালের সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার কুইবেকের কিংস বেঞ্চ কোর্টের বিচারক। প্রধান কৌঁসুলি জোসেফ বি. কীনানও ছিলেন আমেরিকান। 
    অভিযুক্তদের অধিকাংশ ছিলেন সামরিক ও সরকারি কর্মকর্তা। ‘এ’, ‘বি’, ও ‘সি’ ক্যাটাগরির অপরাধে যেসব বেসামরিক ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয় তারা হলেন প্রধানমন্ত্রী কিকো হিরোতা, প্রিভি কাউন্সিলের সভাপতি ব্যারন কিচিরো হিরানুমা, মুখ্য কেবিনেট সচিব নাওকি হোশিনো, প্রিভি সীলের লর্ড কীপার মার্কিস কোইচি কিডো, ইতালিতে নিযুক্ত জাপানি রাষ্ট্রদূত তোশিও শিরাতোরি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিগেনোরি তোগো, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মামুরো শিগামিৎসু, অর্থমন্ত্রী ওকিনোরু কায়া ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউসুকি মাৎসুকা। সামরিক কর্মকর্তাগণ হলেন সাবেক সমরমন্ত্রী ও জাপানের রাজকীয় সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল হাদেকি তোজো, সমরমন্ত্রী জেনারেল সাদাও আরাকি, সাবেক সমরমন্ত্রী ফিল্ড মার্শাল শুনরোকু হাতা, নৌমন্ত্রী ও জাপানের নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল শিগাতারো শিমাদা, চিফ অব মিলিটারি এফেয়ার্স ব্যুরো লে. জেনারেল কেনরায়ো সাতো, কোরিয়ার গভর্নর জেনারেল ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী জেনারেল কুনিয়াকি কোইসো, চিফ অব দ্য ব্যুরো অব নেভাল এফেয়ার্স ভাইস এডমিরাল তাকাজুমি ওকা, জার্মানিতে নিযুক্ত জাপানি রাষ্ট্রদূত লে. জেনারেল হিরোশি ওশিমা, জাপানি রাজকীয় নৌবাহিনীর জেনারেল স্টাফ ফ্লিট এডমিরাল নাগানো ওসামি, কোরিয়ায় নিযুক্ত জাপানের সাবেক গভর্নর জেনারেল জিরো মিনামি, মাঞ্চুকুর (চীনের মাঞ্চুরিয়া) গোয়েন্দা প্রধান জেনারেল কেনজি দোইহারা, বার্মা এরিয়া কমান্ডার জেনারেল হাইতারো কিমুরা, সাংহাই এক্সপিডিশনারী ফোর্সের কমান্ডার জেনারেল আইওয়ানি মাৎসুই, চতুর্দশ আর্মির চিফ অব স্টাফ লে. জেনারেল আকিরা মুতো, সাকুরাকাইয়ের প্রতিষ্ঠাতা কর্নেল কিঙ্গরো হাশিমতো, কোয়াংটাং আর্মির কমান্ডার জেনারেল ইউশিজিরো ইউমেজু, কেবিনেট প্ল্যানিং বোর্ডের প্রধান লে. জেনারেল তেইচি সুজুকি। 
   যুদ্ধাপরাধে ৬ জনকে ফাঁসিতে ঝুঁলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকর করার রায় দেয়া হয়। তারা হলেন মাঞ্চুকুর গোয়েন্দা প্রধান জেনারেল কেনজি দোইহারা, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোকি হিরোতা, সমরমন্ত্রী জেনারেল সেইশিরো ইতাগাকি, চতুর্দশ আর্মির চিফ অব স্টাফ লে. জেনারেল আকিরা মুতো, বার্মা এরিয়া কমান্ডার জেনারেল হাইতারো কিমুরা, কোয়াংটাং আর্মির কমান্ডার জেনারেল ইউশিজিরো ইউমেজু। বি ও সি ক্যাটাগরির অপরাধে সাংহাই এক্সপিডিশনারী ফোর্সের কমান্ডার জেনারেল আইওয়ানি মাৎসুইকে ফাঁসিতে ঝুঁলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকর করার রায় দেয়া হয়। ১৯৪৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর ইকেবকুরোর সুগামো কারাগারে তাদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। জাপানি জনগণের বৈরি হয়ে উঠার আশঙ্কায় জেনারেল ম্যাকআর্থার প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস. ট্রুম্যানের নির্দেশ অমান্য করেন এবং যে কোনো ধরনের ছবি তোলা নিষিদ্ধ করেন।  
   ১৬ জন অভিযুক্তকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়া হয়। তিনজন (কোইসি, শিরাতোরি ও ইউমেজু) কারাগারে মারা যান। বাদবাকি ১৩ জনকে ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যে প্যারোলে মুক্তি দেয়া হয়। শতাধিক আইনজীবী অভিযুক্তদের পক্ষে আদালতে দাঁড়ান। তাদের ৭৫ শতাংশ ছিলেন জাপানি এবং ২৫ শতাংশ আমেরিকান। আসামী পক্ষ ১৯৪৭ সালের ২৭ জানুয়ারি তাদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করেন এবং ২২৫ দিনে তাদের বক্তব্য শেষ করেন। বিবাদী পক্ষ যুক্তি দেয় যে, এ আদালত তার আইনগত বৈধতা, নিরপেক্ষতা ও পক্ষপাতহীনতার সন্দেহ থেকে কখনো মুক্ত হতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্র ট্রাইব্যুনাল পরিচালনায় প্রয়োজনীয় তহবিল ও লোকবল সরবরাহ করে এবং প্রধান কৌঁসুলি নিয়োগ করে।
    বিজয়ী পক্ষ আদালতে এ ধরনের প্রভাব বিস্তার করায় বিচারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। তখন এ ধারণা তৈরি হয় যে, এ ট্রাইব্যুনাল বিজয়ীদের ইচ্ছা পূরণের একটি বাহন। নুরেমবার্গ ট্রায়ালের চেয়ে টোকিও ট্রায়াল ছিল আরো বেশি পক্ষপাতদুষ্ট। মিত্রপক্ষের ১১টি দেশের বিচারক থাকলেও আমেরিকার নেতৃত্বে কৌঁসুলি ছিল মাত্র একটি দেশের। টোকিও ট্রায়ালে সরকারি সমর্থন ছিল নুরেমবার্গ ট্রায়ালের চেয়ে কম। টোকিও ট্রায়ালে মিত্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি সাবেক সহকারি মার্কিন এটর্নি জেনারেল বি. কীনানের অবস্থান ছিল নুরেমবার্গ ট্রায়ালে নিয়োজিত মুখ্য আমেরিকান কৌঁসুলি রবার্ট এইচ. জ্যাকসনের চেয়ে দুর্বল। টোকিও ট্রায়ালের অন্যতম বিচারক ফিলিপাইনের কর্নেল ডেলফিন জারানিলাকে জাপানিরা বন্দি করেছিল। তিনি বাতান ‘ডেথ মার্চ’ থেকে পালিয়ে যান। তার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ থাকায় বিবাদী পক্ষ বেঞ্চ থেকে তাকে অপসারণের দাবি করে। এ অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হয়। টোকিও ট্রায়ালের আরেক বিচারক ভারতের রাধাবিনোদ পাল পাশ্চাত্যের ঔপনিবেশবাদ এবং জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যুক্তরাষ্ট্রের আণবিক বোমা নিক্ষেপকে আদালতের বিচার্য বিষয়ের তালিকা থেকে বাদ দেয়ায় এবং বেঞ্চে পরাজিত দেশগুলোর বিচারক না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন: ‘এ ট্রায়াল বিজয়ীদের প্রতিশোধ গ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছে।’ ভারতীয় জুরিদের মধ্যে রাধাবিনোদ একা নন, কলকাতার বিখ্যাত ব্যারিস্টার বিচারপতি বিভিএ রোলিং-ও পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। তিনি লিখেছেন: ‘টোকিও ট্রাইব্যুনাল বিচারকের উয়িগে একটি তরবারির চেয়ে বেশি কিছু ছিল না। অবশ্যই আমরা মিত্রবাহিনীর বোমাবর্ষণে ইয়োকোহামা, টোকিও এবং অন্য বড় শহরগুলোকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার ব্যাপারে সচেতন ছিলাম। আমরা যুদ্ধের আইনকে সমুন্নত রাখার উদ্দেশ্যে টোকিও ট্রায়ালে অংশগ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু আমরা প্রতিদিন মিত্রবাহিনীকে ভয়ংকরভাবে যুদ্ধের আইন লংঘন করতে দেখেছি।’  
টোকিও ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরু হওয়ার ১০ দিন পর ১৯৪৬ সালের ১৪ মে বিবাদী পক্ষের কৌঁসুলি ক্যাপ্টেন জর্জ ফার্নেস দ্বিতীয় বিশ্বযুুদ্ধে বিজয়ীদের পরিচালিত ট্রাইব্যুনালের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন: ‘এ ট্রাইব্যুনালের সদস্যদের ব্যক্তিগত জ্ঞাত সততা নির্বিশেষে আমরা বলতে চাই যে, তাদের নিযুক্তির শর্ত অনুযায়ী তারা নিরপেক্ষ হতে পারেন না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আজ অথবা ইতিহাসের যে কোনো সময় এমন একটি ট্রাইব্যুনাল তাদের বৈধতা, নিরপেক্ষতা ও পক্ষপাতিত্ব থেকে মুক্ত হতে পারে না।’ এ যুক্তি দেখিয়ে ক্যাপ্টেন ফার্নেস যুদ্ধের প্রতিহিংসা ও ঘৃণা থেকে মুক্ত নিরপেক্ষ দেশের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ট্রাইব্যুনাল গঠনের দাবি জানান।  
    ফার্নেসের যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর বিবাদী পক্ষের আরেকজন কৌঁসুলি মেজর বেন ব্রুস ব্ল্যাকেনি বলেন, যুদ্ধ হলো একটি জাতির সিদ্ধান্ত। কোনো ব্যক্তির সিদ্ধান্ত নয়। অতএব যুুদ্ধে কোনো হত্যাকা-কে খুন হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। তিনি তার যুক্তির সপক্ষে হিরোশিমায় আণবিক বোমা নিক্ষেপের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে বলেন, পার্ল হারবারে জাপানি বোমাবর্ষণে নিহত এডমিরাল কিডের মৃত্যুকে খুন হিসেবে সাব্যস্ত করা হলে হিরোশিমায় কারা আণবিক বোমা নিক্ষেপ করেছিল আমরা তাদের নাম জানি। আমরা আণবিক বোমা নিক্ষেপের পরিকল্পনাকারী চিফ অব স্টাফ এবং দায়ী রাষ্ট্রের নাম জানি। তারা কি সজ্ঞানে খুন করেছেন? এ ব্যাপারে আমাদের সন্দেহ আছে। সশস্ত্র সংঘাতে একপক্ষের কার্যকলাপ ন্যায় এবং শত্রুপক্ষের কার্যকলাপ অন্যায় হিসেবে সাব্যস্ত করা যাবে না। পার্ল হারবারে জাপানি হামলায় নিহত আমেরিকানদের হত্যাকা-কে ‘খুন’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হলে একই যুক্তিতে আণবিক বোমাবর্ষণের জন্য দায়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস. ট্রুম্যান এবং মার্কিন সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ জেনারেল জর্জ সি. মার্শালকে খুনের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা যেতে পারে। কৌঁসুলি মেজর ব্ল্যাকেনি আরো বলেন, হিরোশিমায় জাপানি নাগরিকদের ওপর আণবিক বোমা নিক্ষেপ চতুর্থ হেগ কনভেনশন এবং স্থল যুদ্ধের রীতিনীতির স্পষ্ট লংঘন। 
   ইয়োকোহামায় ‘বি’ শ্রেণীর যুদ্ধাপরাধীদের একটি বিচারে জাপানি শহরগুলোতে আমেরিকান বি-২৯ বোমারু বিমানের বোমাবর্ষণ আদালতের উত্তপ্ত আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন জেনারেল ওকাদা তাসুকু। জেনারেল তাসুকু যথাযথ কোর্ট মার্শাল ছাড়া নাগোয়া সিটিতে ভূপাতিত আমেরিকান বি-২৯ বোমারু বিমানের পাইলটদের হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। জেনারেল ওকাদার প্রধান কৌঁসুলি আমেরিকান আইনজীবী ড. জোসেফ ফিদারস্টোন তার যুক্তিতর্কে বলেন, আমেরিকান বি-২৯ বোমারু বিমানের পাইলটদের নির্বিচার বোমাবর্ষণে অগণিত জাপানি হতাহত হওয়ায় তারা যুদ্ধবন্দি নয় বরং তারা ছিলেন যুদ্ধাপরাধী। অতএব আমেরিকান পাইলটদের মৃত্যুদ- কার্যকর করা ছিল বৈধ। আদালত জেনারেল ওকাদাকে মৃত্যুদ-ে দ-িত করলেও ফিদারস্টোনের যুক্তি ওকাদার অধঃস্তনদের লঘু শাস্তিদানে আদালতকে প্রভাবিত করেছিল।
দ্বিমুখী নীতি
পশ্চিমা মিত্রশক্তি দাবি করছে যে, তাদের সামরিক বাহিনীকে হেগ ও জেনেভা কনভেনশন মেনে চলতে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল এবং তাদের যুদ্ধ ছিল আত্মরক্ষামূলক এবং ন্যায়যুদ্ধ। অনিয়ন্ত্রিত সাবমেরিন যুদ্ধ এবং যুদ্ধ শেষে অক্ষশক্তির সঙ্গে কর্মরত রুশ নাগরিকদের বলপূর্বক সোভিয়েত ইউনিয়নে বহিষ্কারের মতো ঘটনায় এসব আন্তর্জাতিক চুক্তি লংঘন করা হয়। সোভিয়েত সশস্ত্র বাহিনী প্রায়ই যুদ্ধাপরাধে লিপ্ত হয়। পরবর্তীতে জানা গেছে যে, সোভিয়েত সরকারের নির্দেশেই এসব যুদ্ধাপরাধ করা হয়েেেছ। এসব অপরাধের মধ্যে ছিল আগ্রাসী যুদ্ধ ঘোষণা, ব্যাপক হত্যাকা-, যুদ্ধবন্দিদের গণহত্যা এবং বিজিত দেশগুলোর জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক এন্থনি বীভার জার্মানির পতনকালে জার্মান মহিলাদের ধর্ষণকে ইতিহাসের বৃহত্তম গণধর্ষণ হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। তার হিসাবে শুধুমাত্র পূর্ব প্রুশিয়া, পোমেরানিয়া ও সাইলেসিয়ায় কমপক্ষে ১৪ লাখ মহিলাকে ধর্ষণ করা হয়। ঐতিহাসিক বীভার আরো বলেছেন, বন্দি শিবির থেকে মুক্ত রুশ ও পোলিশ মহিলারাও ধর্ষণের শিকার হয়। 
   জর্গ ফ্রেডারিকসহ কয়েকজন ইতিহাসবিদ বলছেন, জার্মানির কোলন, হামবুর্গ ও ড্রেসডেন, ইতালির ?

মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙল রেজিমেন্ট

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ১০টি ইস্ট বেঙল রেজিমেন্ট ছিল। এসব রেজিমেন্ট হলো প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম, নবম ও দশম। ৬টি ব্যাটালিয়ন অবস্থান করছিল পূর্ব পাকিস্তানে এবং বাকি তিনটি পশ্চিম পাকিস্তানে। যুদ্ধ বেঁধে যাবার মুহূর্তে দশম ইস্ট বেঙল রেজিমেন্ট গড়ে তোলার কাজ চলছিল। যুদ্ধের ভেতর গড়ে তোলা হয় একাদশ ইস্ট বেঙল রেজিমেন্ট। মুক্তিযুদ্ধের সময় পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম ইস্ট বেঙল রেজিমেন্ট পশ্চিম পাকিস্তানে আটকা পড়ে। ইস্ট বেঙল রেজিমেন্টের যেসব অফিসার মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন তারা হলেন মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর কেএম সফিউল্লাহ, মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর চিত্তরঞ্জন দত্ত, মেজর কাজী নূরুজ্জামান, মেজর মীর শওকত আলী, মেজর আবুল মঞ্জুর, মেজর আবু তাহের, মেজর আবু ওসমান চৌধুরী, মেজর রফিকুল ইসলাম, মেজর এটিএম হায়দার, মেজর এএনএম নূরুজ্জামান, মেজর নাজমুল হক ও মেজর এমএ জলিল। ইস্ট বেঙল রেজিমেন্টগুলো বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধের হাল না ধরলে ইতিহাস হতো অন্যরকম। ইস্ট বেঙল রেজিমেন্ট ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রাণশক্তি। তাই তাদের ভূমিকা ও অবস্থান নিয়ে আলোচনা করা একান্ত প্রয়োজন।

প্রথম ইস্ট বেঙল রেজিমেন্ট 
১০৭তম পাকিস্তানি ব্রিগেডের অন্তর্ভুক্ত সিনিয়র টাইগার হিসাবে পরিচিত প্রথম ইস্ট বেঙল রেজিমেন্ট অবস্থান করছিল যশোরে। কমান্ডিং অফিসার ছিলেন লে. কর্নেল রেজাউল জলিল। ২৫ মার্চ ক্র্যাকডাউনের দিন এ ব্যাটালিয়ন যশোর সীমান্তের চৌগাছায় শীতকালীন মহড়ায় নিয়োজিত ছিল। ২৯ মার্চ তাদেরকে যশোর তলব করা হয়। যশোর সেনানিবাসে ফিরে আসা মাত্রই ২৫বালুচ রেজিমেন্ট ও ষষ্ঠ ফ্রন্টিয়ার ফোর্স তাদের ঘেরাও করে। ঘেরাও করায় উত্তেজিত হয়ে বাঙালি সৈন্যরা কারো নির্দেশের অপেক্ষা না করে অস্ত্রাগার ভেঙ্গে হাতিয়ার বের করে নিয়ে আসে। উভয়পক্ষে শুরু হয় গোলাগুলি। ঘটনাস্থলে ২৫ জন বাঙালি সৈন্য নিহত হয়। আহত হয় বহু। প্রচণ্ড গোলাগুলির মধ্যে টিকতে না পেরে বাঙালি সৈন্যরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্র“পে বিভক্ত হয়ে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হয়ে আসে এবং চৌগাছার দিকে পালিয়ে যায়। এসব সৈন্য ক্যাপ্টেন হাফিজ ও লে. আনোয়ারের নেতৃত্বে একত্রিত হয়ে প্রতিরোধ লড়াই শুরু করে। লড়াইয়ের এক পর্যায়ে লে. আনোয়ার শহীদ হন। পরিবার পরিজন থাকায় এক শো পিছিয়ে যায়। নিরাপদে ফিরে আসার জন্য মাইকে তাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। পরে তাদের সবাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়। কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল রেজাউল জলিলকে বন্দি করে ঢাকায় আনা হয় এবং পরে তাকে পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানো হয়। যশোর ক্যান্টনমেন্টে অবস্থানরত ৪০ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্সের বাঙালি সৈন্যরাও আক্রান্ত হয়। ১ ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্সের বাঙালি সৈন্যরা বিদ্রোহ করে। বাঙালি কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল হাই ও ক্যাপ্টেন শেখকে তাদের অফিসে হত্যা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধকালে প্রথম ইস্ট বেঙল রেজিমেন্ট ১১ নম্বর সেক্টরে মেজর জিয়াউর রহমানের অধীনস্থ হয়। এ ব্যাটালিয়ন ‘জেড ফোর্স-এর অন্তর্ভুক্ত হলে তার নেতৃত্ব দেন প্রথমে মেজর মইনুল হোসেন চৌধুরী এবং পরে মেজর জিয়াউদ্দিন।

দ্বিতীয় ইস্ট বেঙল রেজিমেন্ট
৫৭তম পাকিস্তানি ব্রিগেডের অন্তর্ভুক্ত দ্বিতীয় ইস্ট বেঙল রেজিমেন্ট অবস্থান করছিল ঢাকার অদূরে জয়দেবপুরে। এ ব্যাটালিয়নের একটি কোম্পানি অবস্থান করছিল ময়মনসিংহে এবং আরেকটি টাঙ্গাইলে। দ্বিতীয় ইস্ট বেঙল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার ছিলেন বাঙালি লে. কর্নেল মাসুদ। সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ছিলেন মেজর কেএম সফিউল্লাহ। ১৯ মার্চ জয়দেবপুরে জনতা প্রতিরোধ গড়ে তুললে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙল রেজিমেন্টকে ব্যারিকেড অপসারণের নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু তারা এ নির্দেশ পালনে দ্বিধা দ্বন্দ্বে পড়ে যায়। লে. কর্নেল মাসুদকে ঢাকায় ডেকে এনে অন্তরীণ করা হয়। ২৪ মার্চ তার স্থলে অনুগত বাঙালি লে. কর্নেল রকিবকে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার নিয়োগ কর হয়। তিনি যখন জয়দেবপুুরে পৌঁছান তখন বাঙালি সৈন্যরা ছিল বিদ্রোহের দ্বারপ্রান্তে। ২৮ মার্চ দ্বিতীয় ইস্ট বেঙল রেজিমেন্ট বিদ্রোহ করে। বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন মেজর সফিউল্লাহ। তাকে সহযোগিতা করেন মেজর মইনুল হোসেন চৌধুরী, ক্যাপ্টেন আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম, লে. আজিজ, লে. এজাজ, লে. হেলাল মোর্শেদ খান, লে. সৈয়দ মোহাম্মদ ইব্রাহিম প্রমুখ অফিসার। ২৮ মার্চ রাতে বিদ্রোহকালে গোলাগুলিতে দু’জন বাঙালি সৈন্য এবং তিনজন অবাঙালি অফিসার ও একজন জেসিও নিহত হয়। ২৯ মার্চ এ রেজিমেন্টের উপর পাকিস্তান বিমান বাহিনী বোমাবর্ষণ করে। মেজর সফিউল্লাহর নেতৃত্বে এ ব্যাটালিয়ন টাঙ্গাইল হয়ে ময়মনসিংহের পথে রওনা দেয়। ৩১ মার্চ মেজর সফিউল্লাহ আখাউড়ায় মেজর খালেদ মোশররফের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। একত্রিতভাবে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করার জন্য তারা সীমান্তের দিকে এগিয়ে যান। তাদের সঙ্গে ইপিআরের সৈন্যরা যোগ দেয়। ২ নম্বর সেক্টরে মেজর সফিউল্লাহর নেতৃত্বে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙল রেজিমেন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ‘এস ফোর্স’ গঠন করা হলে এ রেজিমেন্ট কমান্ড করেন মেজর মইনুল হোসেন চৌধুরী। তার আগে তিনি প্রথম ইস্ট বেঙল রেজিমেন্ট কমান্ড করেন।
তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট
মুক্তিযুদ্ধে তৃতীয় ইস্ট বেঙল রেজিমেন্টের অবদান অসামান্য। এ রেজিমেন্ট প্রথমে মেজর জিয়াউর রহমান এবং পরে মেজর মীর শওকতের অধীনে দায়িত্ব পালন করে। ৪ মার্চ তৃতীয় বেঙলের অবস্থান ছিল সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টে। দিনটি ছিল ব্যাটালিয়নটির জধরংরহম উধু বা প্রতিষ্ঠা দিবস। পহেলা মার্চ থেকে পাক বাহিনী বাংলাদেশের অন্যান্য সেনানিবাসের মতো এখানেও তৃতীয় বেঙলকে নিরস্ত্র করার চেষ্টা চালায়। সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টে ৪ মার্চ এক ‘দরবার’ অনুষ্ঠিত হয়। এই অনুষ্ঠানে ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার সব র‌্যাঙ্কের সদস্যদের উদ্দেশে বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য রাখেন। ‘দরবার’ চলার সময় অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও বিধি বহির্ভূতভাবে তৃতীয় বেঙলের আবাসিক এলাকার চারপাশে ২৫ এফএফ রেজিমেন্ট ও সশস্ত্র সেনাদল নিয়োগ করা হয়। এই ঘটনা জানাজানি হয়ে গেলে তৃতীয় বেঙলের সেনা সদস্যের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। এরপর থেকে তৃতীয় বেঙলের ব্যারাকগুলোর আশপাশে অস্ত্রধারী পাকসেনাদের গতিবিধি ক্রমশই বাড়তে থাকে। এর মধ্যে তৃতীয় বেঙলকে ঘিরে পরিখাও খোড়া হয়। পাকিস্তানিদের এসব উদ্দেশ্যপূর্ণ কাজকর্ম দেখে বাঙালি সেনাদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে তৃতীয় বেঙলের বাঙালি সেনাসদস্যরা আত্মরক্ষা ও প্রয়োজনে স্বজাতির মুক্তির জন্য লড়াইয়ের প্রত্যয়ে বেশ কয়েকবার অননুমোদিতভাবে অস্ত্রধারণ করে।
২৫ মার্চের আগে থেকেই বাংলাদেশে অবস্থিত বেঙল রেজিমেন্টের অন্য সব ব্যাটালিয়নের মতো তৃতীয় বেঙলের শক্তি কমিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে তাদেরকে ছোট ছোট দলে বিভক্ত করে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেয়া হয়। অজুহাত হিসাবে ভারতীয় আগ্রাসন ঠেকানোর মনগড়া কাহিনী শোনানো হয়। পাক বাহিনীর পরিকল্পনা কার্যকর করার পথে তৃতীয় বেঙল যেন সংগঠিত হয়ে বাধা দিতে না পারে সেজন্যই তাদেরকে এভাবে ছত্রখান করে দেয়া হয়। নীলনকশা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আলফা কোম্পানিকে পার্বতীপুরে পাঠানো হয়। সঙ্গে যান পাকিস্তানি মেজর সৈয়দ সাফায়েত হোসেন। চার্লি কোম্পানিকে ক্যাপ্টেন আশরাফের নেতৃত্বে ঠাকুরগাঁও পাঠানো হয়। পলাশবাড়ি/ঘোড়াঘাট এলাকায় অবস্থান নেয় ব্র্যাভো ও ডেল্টা কোম্পানি। এদের সঙ্গে পাঠানো হয় মেজর নিজামউদ্দিন, ক্যাপ্টেন মোখলেস ও লে. রফিককে। সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টে অবস্থান করছিল উল্লেখিত কোম্পানিগুলোর রিয়ার পার্টি, ব্যাটালিয়ন হেডকোয়ার্টার ও হেডকোয়ার্টার কোম্পানির কিছু সেনা সদস্য। ৩১ মার্চ পাক সেনাদের হাতে আক্রান্ত হওয়ার দিন পর্যন্ত ক্যাপ্টেন আনোয়ার, লে. সিরাজ ও সুবেদার মেজর হারিস তাদের সঙ্গে ক্যান্টনমেন্টে অবস্থান করছিলেন। সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টে আরো ছিলেন সিও লে. কর্নেল ফজল করিম ও সেকেন্ড-ইন-কমান্ড মেজর আকতার। এই দু’জনই ছিলেন পাকিস্তানি। সিও ফজল করিম ছিলেন প্রবলভাবে বাঙালি বিদ্বেষী।
 ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যার মাধ্যমে পাক বাহিনী বাঙালিদের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ শুরু করার পর ঘোড়াঘাটে অবস্থানরত তৃতীয় বেঙলের সৈন্যরা ২৮ মার্চ পলাশবাড়িতে লে. রফিকের নেতৃত্বে একটি বড় ধরনের অ্যাম্বুশ করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বগুড়ার দিকে অগ্রসরমান ২৫ এফএফ রেজিমেন্টের উপর অতর্কিত আঘাত হেনে তাদেরকে নির্মূল করে দেয়া। ২৫ এফএফ রেজিমেন্টের চতুর পাকিস্তানি লে. কর্নেল গোলাগুলি শুরু হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে অনভিজ্ঞ তরুণ লে. রফিককে যুদ্ধের বদলে আলোচনার মাধ্যমে সঙ্কট নিরসনের আহ্বান জানান। সিংহ হৃদয়ের অধিকারী এই তরুণ বাঙালি অফিসার সরল বিশ্বাসে পাকিস্তানি কর্নেলের কাছে যাওয়া মাত্রই পাক সেনারা তাকে জোর করে কর্নেলের গাড়িতে উঠিয়ে মুহূর্তের মধ্যে রংপুরের দিকে রওনা হয়। এই ঘটনায় দু’পক্ষের মধ্যে সঙ্গে সঙ্গে গুলিবিনিময় শুরু হয়ে যায়। প্রচণ্ড গোলাগুলির এক পর্যায়ে ২৫ এফএফ রেজিমেন্ট টিকতে না পেরে রংপুরের দিকে পালিয়ে যায়। তাদের পক্ষে অনেকে হতাহত হয়। রক্তক্ষয়ী এই যুদ্ধে তৃতীয় বেঙলের দু’জন সৈন্য শহীদ, একজন অফিসার বন্দি এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়। এই সংঘর্ষের পর শত্র“ মিত্র চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত হয়ে যায়। সংঘর্ষের এই খবর সৈয়দপুর পৌঁছানো মাত্র সেখানে অবস্থানরত তৃতীয় বেঙলের সৈন্যদের মধ্যে উত্তেজনা আরো বেড়ে যায়।
৩০ মার্চ তৃতীয় বেঙলের ব্যাটালিয়ন অ্যাডজুট্যান্ট সিরাজকে রংপুর ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে একটি কনফারেন্সে যোগ দেয়ার জন্য পাঠানো হয়। তার সঙ্গে ১০/১২ জন সশস্ত্র প্রহরী ছিল। পাকিস্তানিরা পথে তাদেরকে বন্দি করে এবং অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় সে রাতেই প্রায় সবাইকে নির্মমভাবে হত্যা করে। দলটির মাত্র একজন সদস্য দৈবক্রমে বেঁচে যায়। পরে তিনি তৃতীয় বেঙলের সঙ্গে আবার মিলিত হতে পেরেছিলেন। তখন রংপুর ব্রিগেডের গুরুত্বপূর্ণ ব্রিগেড মেজর পদে আসীন ছিলেন বাঙালি মেজর আমজাদ আহমেদ চৌধুরী। ৩০ মার্চ দিবাগত রাতে পাকিস্তানি ২৫ এফএফ রেজিমেন্ট সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টে অবস্থানরত তৃতীয় বেঙলের আবাসিক অবস্থানগুলোতে কামানের প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ করে। সেখানকার একমাত্র বাঙালি অফিসার আনোয়ার ছিলেন কোয়ার্টার মাস্টার। আনোয়ার ও সুবেদার হারিস মিয়ার নেতৃত্বে সেনানিবাসে অবস্থানরত তৃতীয় বেঙলের স্বল্পসংখ্যক সৈন্য দ্রুত সংগঠিত হয়ে এই আক্রমণ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে অমিত বিক্রমে রুখে দাঁড়ান। পাকিস্তানি সৈন্যরা এক পর্যায়ে কামানের গোলাবর্ষণ থামিয়ে উত্তরদিক থেকে অ্যাসল্ট লাইন বানিয়ে হামলা চালায়। তৃতীয় বেঙলের বীর সৈন্যরা অত্যন্ত ক্ষিপ্রতা ও দক্ষতার সঙ্গে এ হামলা প্রতিরোধ করে। নিজেদের পক্ষে ব্যাপক হতাহত হওয়ায় এবং আক্রমণে খুব একটা সুবিধা করতে না পারায় পাকিস্তানি সৈন্যরা তখনকার মতো রণে ভঙ্গ দেয়। কয়েক ঘন্টা পর ২৫ এফএফ রেজিমেন্ট আবার কামানের গোলার ছত্রছায়ায় আক্রমণ চালায়। এবারের আক্রমণ আসে উত্তর পশ্চিম দিক থেকে। এ পর্যায়ের প্রচণ্ড সংঘর্ষে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে আক্রমণকারী পাকিস্তানি সৈন্যরা একসময় পিছিয়ে যায়। ভোর হয়ে এলে লড়াই স্তিমিত হয়ে পড়ে। কিন্তু দিনের আলোয় রংপুুর থেকে ট্যাংক-বিধ্বংসী কামানগুলো সামরিক মহড়ার নামে সুকৌশলে ব্যাটালিয়ন থেকে সরিয়ে দিনাজপুরে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এ অবস্থায় দিনের আলোয় ক্যান্টনমেন্ট থেকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ছিল আত্মহত্যার শামিল। নিজেদের পক্ষে প্রচুর হতাহত হওয়ায় এবং শত্র“ পক্ষ ভারি অস্ত্র সজ্জিত থাকায় আনোয়ার তৃতীয় বেঙলের সৈন্যদেরকে কৌশলগতভাবে পশ্চাদপসরণের নির্দেশ দেন।
তৃতীয় বেঙলের সৈন্যরা বিক্ষিপ্তভাবে গুলি চালাতে চালাতে দুই অংশে বিভক্ত হয়ে পিছিয়ে আসে। একদল পাকিস্তানি কামানের আওতার বাইরে বদরগঞ্জে অবস্থান গ্রহণ করে। অন্য দলটি অবস্থান নেয় ফুলবাড়িতে। ক্যান্টনমেন্টের এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে তৃতীয় বেঙলের প্রায় ২০ জন শহীদ এবং ৩০ থেকে ৩৫ জনের মতো সদস্য আহত হয়। এছাড়া কয়েকজন নিখোঁজ হয়েছিল। পাকিস্তানিদের পক্ষেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ক্যান্টনমেন্টের রিয়ার পার্টির উপর হামলার খবর পেয়ে ঠাকুরগাঁও এবং পার্বতীপুরে অবস্থানরত চার্লি ও আলফা কোম্পানি সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণের উদ্দেশ্যে ২ এপ্রিল ফুলবাড়িতে একত্রিত হয়। ফুলবাড়িতে দিনাজপুর সেক্টরের ইপিআরের বহু সদস্য বিদ্রোহ করে এবং তৃতীয় বেঙলের সৈন্যদের সঙ্গে যোগ দেয়। আলফা কোম্পানি ফুলবাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ায় একদল পাকিস্তানি সৈনা ও সশস্ত্র বিহারী পাবর্তীপুর এলাকা দখল করে নেয়। এই যুদ্ধে তৃতীয় বেঙলের একজন শহীদ ও কয়েকজন আহত হয়। প্রায় একই সময় চার্লি কোম্পানি ভুষিরবন্দরে পাকিস্তানি অবস্থানে প্রচন্ড আক্রমণ চালায়। চার্লি কোম্পানির আক্রমণের তীব্রতায় পাকিস্তানি সৈন্যরা প্রথমবারের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে ট্যাংক ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। এ যুদ্ধে চার্লি কোম্পানির বেশ কয়েকজন হতাহত হলে তারা আক্রমণ বন্ধ করে এক পর্যায়ে পিছিয়ে আসে। চার্লি কোম্পানি এবার অবস্থান নেয় চরখাইয়ের কাছে খোলাহাটিতে। 
ঘোড়াঘাটে মেজর নিজামের নেতৃত্বে তৃতীয় বেঙলের একটি কোম্পানি অবস্থান করছিল। ২৬/২৭ মার্চে বগুড়া থেকে ২৩তম ফিল্ড রেজিমেন্টের দু’টি ব্যাটারি সৈয়দপুরে আসার চেষ্টা করছিল। এ সংবাদ পেয়ে মেজর নিজাম লে. রফিককে একটি প্লাটুন এবং লে. মোখলেসকে আরেকটি প্লাটুন নিয়ে পলাশবাড়ি রোড জংশনে অবস্থান গ্রহণের নির্দেশ দেন। লে. রফিক যথাসময়ে পলাশবাড়ি পৌঁছান। কিন্তু লে. মোখলেসের পৌঁছতে দেরি হয়ে যায়। ইতিমধ্যে পাকিস্তানিরা পলাশবাড়ি এসে লে. রফিককে আক্রমণ করে বসে। পাকিস্তানিদের সঙ্গে সংঘর্ষে লে. রফিক ধরা পড়েন এবং তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার পর মেজর নিজাম তার অবশিষ্ট সৈন্য নিয়ে ফুলবাড়িতে সুবেদার শুক্কুরের সঙ্গে মিলিত হন। মেজর নিজাম পাবর্তীপুরে পাকিস্তানি ঘাঁটি আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৭ এপ্রিল হলদিবাড়িতে একটি প্লাটুন রেখে তিনি পাবর্তীপুরে পাকিস্তানি ঘাঁটি আক্রমণ করেন। কিন্তু তার এ আক্রমণ ব্যর্থ হয়। পাবর্তীপুর যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা চরমভাবে মার খায়। অনেকে মনে করেন মেজর নিজামের ভুল সিদ্ধান্তে মুক্তিযোদ্ধাদের বিপর্যয় ঘটে। পাবর্তীপুরে পাকিস্তানি ঘাঁটিতে মর্টারের কয়েকটি গোলাবর্ষণ করেই তিনি সৈন্যদের হামলা চালানোর নির্দেশ দেন। মর্টারের গোলাবর্ষণের সময় পাকিস্তানি সৈন্যরা চুপচাপ ছিল। মুক্তিযোদ্ধারা চার্জ করতে এগিয়ে যাওয়া মাত্র তাদের কামানগুলো একসঙ্গে গর্জে উঠে। পাবর্তীপুর থেকে পিছু হটে মুক্তিযোদ্ধারা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় হাবরায় পুনরায় প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান গ্রহণ করে। ১২ এপ্রিল পাকিস্তান বাহিনী ট্যাংক ও ভারি অস্ত্রের সহায়তায় হাবরায় আক্রমণ করে। পাকিস্তানি সৈন্যদের ব্যাপক আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। ক্যাপ্টেন আনোয়ার তার কিছুসংখ্যক সৈন্য, ইপিআর, আনসার ও মুজাহিদ নিয়ে বদরগঞ্জে অবস্থান গ্রহণ করেন।
এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ নাগাদ প্রায় গোটা তৃতীয় বেঙল চরখাই-খোলাহাটিতে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান গ্রহণ করে। খোলাহাটিতে স্থাপন করা হয় হেডকোয়ার্টার। কয়েকটি যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে ব্যাটালিয়নের সদস্য সংখ্যা ব্যাপক হ্রাস পায়। বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া কিছু সৈন্য ব্যাটালিয়নের সঙ্গে মিলিত হওয়ার আশায় দিনাজপুর, রংপুর ও বগুড়ার বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করতে থাকেন। অফিসারদের মধ্যে একমাত্র আনোয়ার তখন ব্যাটালিয়নে। আশরাফ ও মোখলেস নিখোঁজ ও নিজামউদ্দিন শহীদ হন। তৃতীয় বেঙল খোলাহাটি থাকার সময় সম্ভবত ৯ এপ্রিল আনোয়ার রংপুর ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণের উদ্দেশ্যে বদরগঞ্জে রেকি করতে যান। তার সঙ্গে ছিল মাত্র কয়েকজন প্রহরী। এ সময় ভুল করে হঠাৎ তিনি জীপসহ ২৫ এফএফ রেজিমেন্টের সৈন্যদের মধ্যে ঢুকে পড়েন। পাকিস্তানি এফএফ রেজিমেন্ট আর ইপিআরের চামড়ার সরঞ্জামাদি দু’টিই কালো রংয়ের হওয়ায় এই বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। মুহূর্তে দু’পক্ষই নিজেদের ভুল বুঝতে পারে। শুরু হয় গুলিবিনিময়। মাত্র কয়েকজন যোদ্ধাসহ আনোয়ার বন্দি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থেকে মরণপণ যুদ্ধ করে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। এ যুদ্ধে আনোয়ার গুলিবিদ্ধ হন। পরে কৌশলে পাকিস্তানিদের ঐ শক্তিশালী অবস্থান অতিক্রম করে তিনি ও তার সহযোদ্ধারা সেদিনই খোলাহাটিতে অবস্থানরত তৃতীয় বেঙলে ফিরে আসেন। তবে ঐ এলাকার ম্যাপসহ জীপটি শত্র“পক্ষের হাতে পড়ে যায়। ম্যাপে তৃতীয় বেঙলের বিভিন্ন কোম্পানির অবস্থান চিহ্নিত ছিল বলে বিমান আক্রমণের আশঙ্কায় সেদিনই তৃতীয় বেঙলকে দু’ভাগ করে ছড়িয়ে দেয়া হয়। এক অংশ চলে যায় চরখাই-ফুলবাড়ি এলাকায় এবং অন্য অংশ অবস্থান নেয় হিলি এলাকায়। 
১৩ ও ১৪ এপ্রিল চরখাইয়ে অবস্থানরত তৃতীয় বেঙলের সৈন্য ও ইপিআরের বাঙালি সদস্যরা রেললাইন ধরে অগ্রসরমান পাকিস্তানি সৈন্যদের মোকাবিলায় ব্যাপক আকারে অ্যাম্বুশ স্থাপন করে। পাকিস্তানি সৈন্যরা রেললাইন ধরে হিলির উদ্দেশ্যে রওনা হয়। রেললাইনের দু’পাশের গ্রামগুলোতে আগুন লাগাতে লাগাতে তারা অগ্রসর হচ্ছিল। অ্যাম্বুশের ফাঁদে আসা মাত্র পাকিস্তানি সৈন্যরা প্রচণ্ড গোলাগুলির মধ্যে পড়ে যায়। কয়েক মিনিটের মধ্যে বহু সৈন্য হতাহত হলে আত্মরক্ষার জন্য তারা পার্বতীপুরের দিকে পশ্চাদপসরণ করে। এ যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীরও কয়েকজন হতাহত হয়। ১৪ এপ্রিল আলফা কোম্পানির প্লাটুন কমান্ডার নায়েব সুবেদার ওহাবকে ঘোড়াঘাট-হিলি রোডে পাকিস্তানি সৈন্যদের প্রতিরক্ষা অবস্থানে হামলা চালাতে পাঠানো হয়। অগ্রসরমান এই সৈন্যদলের অলক্ষ্যে পাঁচবিবি-হিলি রোড ধরে আসা আরেকটি শক্তিশালী শত্র“ বাহিনী অতর্কিতে তাদেরকে পেছন দিক থেকে হামলা করে বসে। তাদের উপর পেছনের শত্র“ অবস্থান থেকে অবিরাম মেশিনগান আর মর্টারের গোলাবর্ষণ করা হতে থাকে। একমাত্র রাস্তা ছাড়া কভার নেয়ার জন্য কোনো উঁচু স্থান ছিল না। রাস্তার দু’পাশে ছিল বিস্তৃত ধানখেত। ঐ অবস্থানে সারাদিন যুদ্ধের পর রাতের অন্ধকারে ওহাবের প্লাটুন পশ্চাদপসরণ করতে সক্ষম হয়। এই সংঘর্ষে তৃতীয় বেঙলের একজন শহীদ ও ১৩ জন আহত হয়। ওহাব আহতদের সবাইকে তাদের মূল প্রতিরক্ষা অবস্থানে নিয়ে আসতে পেরেছিলেন। 
মে মাসের প্রথম সপ্তাহে আলফা ও চার্লি কোম্পানির যৌথ সৈন্য দল মোহনপুর ব্রিজ এলাকায় শত্র“ অবস্থানে আক্রমণ করে। এ হামলায় দু’পক্ষেরই বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়। তৃতীয় বেঙলের দু’জন এনসিও নিহত এবং কয়েকজন আহত হয়। এই অভিযানের দু’একদিন পর আলফা কোম্পানি দিনাজপুরের রামসাগর এলাকায় পাকিস্তানি অবস্থানে হামলা করে এবং সাফল্যের সঙ্গে শত্র“পক্ষকে পর্যুদস্ত করে ফিরে আসে। মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই তৃতীয় বেঙল মিত্রবাহিনীর পরামর্শ মতো অ্যাম্বুশ, রোড মাইন স্থাপন ও ব্রিজ ধ্বংসের মতো কম ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে থাকে। মে মাসের মাঝামাঝি পাঁচবিবি-জয়পুরহাট রাস্তায় মাইন বিস্ফোরণে পাকিস্তান বাহিনীর একটি গাড়ি বিধ্বস্ত হলে একজন অফিসার ও ১৩ জন সৈন্য নিহত হয়। চরখাই অবস্থানকালে এপ্রিলের শেষদিকে মিত্রবাহিনীর সঙ্গে তৃতীয় বেঙলের যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়। তৃতীয় বেঙলে তখন একজন অফিসারসহ বিভিন্ন র‌্যাঙ্কের ৪১৬ জন সৈন্য ছিল। পরবর্তীকালে মিত্রবাহিনীর পরামর্শে দু’টি কোম্পানি স্থানান্তরিত হয় ভারতীয় সীমান্তবর্তী এলাকা রায়গঞ্জে। আনোয়ারের দু’টি কোম্পানি হিলি-বালুরঘাট এলাকায় থেকে যায়। মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে মেজর শাফায়াত জামিল এ দু’টি কোম্পানির অধিনায়কত্ব গ্রহণ করেন এবং বালুরঘাটের কামারপাড়া নামে একটি জায়গায় তৃতীয় বেঙলের পুনর্গঠনে হাত দেন। ১৪ জুন মুক্তিবাহিনীর ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশে মেজর শাফায়াত জামিল সাত নম্বর সেক্টরে সৈন্য সংগ্রহের জন্য আসেন। তিনি ইপিআরের ৫ শতাধিক সদস্যকে তৃতীয় বেঙলের অন্তর্ভুক্ত করে তাকে পুরোপুরি একটি ব্যাটালিয়নে রূপান্তরিত করেন। তৃতীয় বেঙলই ‘জেড ফোর্স’-এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

চতুর্থ ইস্ট বেঙল রেজিমেন্ট
২৫ মার্চ চতুর্থ ইস্ট বেঙল রেজিমেন্ট অবস্থান করছিল কুমিল্লায়। এ রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার ছিলেন বর্ষীয়ান পাঞ্জাবী লে. কর্নেল খিজির হায়াত খান। মেজর খালেদ মোশাররফ ছিলেন সেকেন্ড-ইন-কমান্ড। অন্যান্য বাঙালি অফিসারদের মধ্যে ছিলেন মেজর শাফায়াত জামিল, ক্যাপ্টেন আইনুদ্দিন, ক্যাপ্টেন গাফফার, ক্যাপ্টেন আবদুল মতিন, লে. হারুন প্রমুখ। এ রেজিমেন্টের একটি কোম্পানি অবস্থান করছিল শমসেরনগরে এবং আরেকটি ব্রাক্ষণবাড়িয়ায়। মেজর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে চতুর্থ বেঙল রেজিমেন্ট বিদ্রোহ করে। কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল খিজির হায়াতকে বন্দি করা হয়। তবে এই বিনয়ী পাকিস্তানি কর্নেলকে হত্যা না করে ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ভারত সীমান্তে এগিয়ে যাবার আগে চতুর্থ ইস্ট বেঙল রেজিমেন্টের সঙ্গে পাকিস্তানি সৈন্যদের সংঘর্ষ হয়। এ রেজিমেন্টকে ব্রাক্ষণবাড়িয়া, আখাউড়া, লাকসাম প্রভৃতি জায়গায় জনতা অভিনন্দন জানায়। মেজর সফিউল্লাহর দ্বিতীয় ইস্ট বেঙল ও মেজর খালেদের চতুর্থ ইস্ট বেঙল রেজিমেন্ট আখাউড়া, ব্রাক্ষণবাড়িয়া, শমসেরনগর ও সিলেটে সম্মিলিতভাবে লড়াই করে। সেক্টর গঠিত হওয়ার পর চতুর্থ ইস্ট বেঙল ২ নম্বর সেক্টরের আওতায় লড়াই করে। চতুর্থ, নবম ও ১০ম ইস্ট বেঙল রেজিমেন্ট নিয়ে ‘এস ফোর্স’ গঠন করা হয়। ‘এস ফোর্সে’ চতুর্থ বেঙলের নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন গাফফার।
 
অষ্টম ইস্ট বেঙল রেজিমেন্ট
২৫ মার্চ অষ্টম ইস্ট বেঙল রেজিমেন্ট চট্টগ্রামের ষোলশহরে অবস্থান করছিল। কমান্ডিং অফিসার ছিলেন পাঞ্জাবী লে. কর্নেল আবদুর রশীদ জানজুয়া। টু-আই-সি ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান। অন্য বাঙালি অফিসারদের মধ্যে ছিলেন মেজর মীর শওকত, ক্যাপ্টেন অলি আহমদ, ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামন চৌধুরী, লে. শমসের মোবিন চৌধুরী। চট্টগ্রামে পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজ ‘এমভি সোয়াত’ এসে নোঙ্গর করে। জনতা এ যুদ্ধজাহাজ থেকে অস্ত্র খালাসে বাধা দেয়। ব্যাপকভাবে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে মেজর জিয়াকে অস্ত্র খালাস তদারকি করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। নির্দেশ অনুযায়ী তিনি রাত সাড়ে ১১টায় রাস্তার ব্যারিকেড অপসারণ করে বন্দরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। এসময় ক্যাপ্টেন খালেক ছুটে গিয়ে আগ্রাবাদে তার জীপ থামান। বন্দরে নিয়োজিত বাঙালি সৈন্যদের উপর পাকিস্তানি সৈন্যদের গুলিবর্ষণের সংবাদ দেয়া হলে মেজর জিয়া তৎক্ষণাৎ জীপ ঘুরিয়ে ষোলশহরে ফিরে গিয়ে বললেন, `We revolt.' আমরা বিদ্রোহ করলাম। জিয়াকে সৈন্যরা স্বাগত জানায়। পাঞ্জাবী কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল জানজুয়াকে তিনি বন্দি করেন। পরে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। মেজর জিয়ার নেতৃত্বে কালুরঘাট থেকে অষ্টম ইস্ট বেঙল রেজিমেন্ট প্রতিরোধ লড়াই শুরু করে। মেজর মীর শওকত এক কোম্পানি সৈন্য নিয়ে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে রওনা দেন। ২৭ মার্চ অষ্টম ইস্ট বেঙল রেজিমেন্ট শহর ছেড়ে চলে গেলেও শত্র“র প্রবল আক্রমণের মুখে ক্যাপ্টেন রফিক ইপিআর বাহিনী নিয়ে ৩ এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রাম শহর দখলে রাখেন।
 
দশম ইস্ট বেঙল রেজিমেন্ট
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে নবগঠিত দশম ইস্ট বেঙল রেজিমেন্ট ভালোভাবে সক্রিয় হতে পারেনি। এ ব্যাটালিয়ন ছিল একটি মিশ্র ইউনিট। ২৫ মার্চ কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল মুয়ীদসহ এ ব্যাটালিয়নের সবাইকে নিরস্ত্র করা হয়। নিরস্ত্র করা হলে এ ব্যাটালিয়ন কার্যত অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে। ২৫ মার্চ রাতে বেশকিছু বাঙালি সৈন্য পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। বাকিরা বন্দি হয়। দশম ইস্ট বেঙল রেজিমেন্টের জীবিত সৈন্যরা মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করে। ‘কে ফোর্স’ গঠন করা হলে দশম ইস্ট বেঙল রেজিমেন্ট ২ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফের কমান্ডে লড়াই করে। 
 (লেখাটি ‘২৬৭ দিনের মুক্তিযুদ্ধ’ থেকে নেয়া। বইটি প্রকাশ করেছে আফসার ব্রাদার্স)

মুক্তিযুদ্ধে ডান ও ইসলামপন্থী শক্তিগুলোর ভূমিকা


ডান ও ইসলামপন্থী শক্তি ও দলগুলো মুক্তিযুদ্ধের বিপরীত অবস্থান গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে পরবর্তীতে নিজেদের সীমাহীন ঘৃণার পাত্রে পরিণত করে। সংখ্যায় তারা ছিল নগণ্য। যেসব দল মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসালামী, নেজামে ইসলাম, পিডিপি প্রভৃতি। পাকিস্তান রক্ষায় তারা সশস্ত্র উপায়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে। ভারতের প্রতি ছিল তাদের চরম অবিশ্বাস। ইতিহাসের আলোকে তারা দেখতে পেয়েছিল, উপমহাদেশে হিন্দু ও মুসলিম শক্তি বরাবরই বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে। কিন্তু ১৯৭১ সালে হিন্দু প্রধান ভারত তাদের চিরাচরিত স্বভাব পরিত্যাগ করায় এবং মুসলিম প্রধান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অকাতরে সমর্থন দেয়ায় তাদের সন্দেহ ঘনীভূত হয়। তারা আশংকা করছিল হয়তো অখন্ড ভারত কায়েম নয়তো বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্র বানানোর অভিসন্ধি থেকে দিল্লি মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন দিচ্ছে। এ ধরনের আশংকা থেকে ইসলামপন্থী দলগুলো মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। 
     জামায়াতে ইসলামীর নেতা অধ্যাপক গোলাম আজমের মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নেয়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে অ্যান ইসলাম ইন বাংলাদেশ ওয়েবসাইটের এক ব্যাখ্যায় বলা হয়, Like all other Islamic parties and groups, he did not support the Liberation War of Bangladesh. The reasons for not supporting the Liberation War of 1971 was - he did not believe that independence from Pakistan would solve our problem. He believed in self-rule or autonomy and continued to campaign in favour of that. His main opposition to the Liberation War was that it was fully surrounded by India and therefore, gaining independence with India's support would result in the country being indirectly controlled and ruled by India. He feared that India would become a bully and would do everything in its power to dominate the politics and economy of the country.‘

‘অন্যান্য ইসলামী দল ও গ্র“পের মতো তিনি (অধ্যাপক গোলাম আজম) বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেননি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে তার সমর্থন না করার পেছনে কারণ ছিল তিনি বিশ্বাস করতেন না যে, পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভে আমাদের সমস্যার সমাধান হবে। তিনি স্বশাসন বা স্বায়ত্তশাসনে বিশ্বাস করতেন এবং স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে প্রচারণা অব্যাহত রেখেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করার পেছনে তার মূল কারণ ছিল বাংলাদেশ হলো পুরোপুরিভাবে ভারত পরিবেষ্টিত। অতএব ভারতের সহায়তায় স্বাধীনতা অর্জিত হলে পরোক্ষভাবে ভারত হবে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণকারী ও শাসক। তিনি আশংকা করতেন যে, ভারত উৎপীড়কে পরিণত হবে এবং এ দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় তাদের সব ধরনের শক্তি কাজে লাগাবে।’ 
 
পিস কমিটি
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে কতিপয় ডানপন্থী রাজনৈতিক দল মুক্তিযুদ্ধ প্রতিহত করার জন্য পাকিস্তান সরকারকে সহযোগিতা প্রদানের ঘোষণা দেয়। ৪ এপ্রিল পিডিপি নেতা নূরুল আমিনের নেতৃত্বে অধ্যাপক গোলাম আজম এবং খাজা খয়েরউদ্দিনসহ ১২ জন নেতার সমন্বয়ে একটি প্রতিনিধিদল ‘খ’ অঞ্চলের সামরিক আইন প্রশাসক লে. জেনারেল টিক্কা খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। টিক্কা খানের সঙ্গে সাক্ষাৎকারীগণ নাগরিক শান্তি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। ৭ এপ্রিল কনভেনশন মুসলিম লীগের নেতা খান আব্দুস সবুর খান টিক্কা খানের সঙ্গে দেখা করেন। তারই সূত্র ধরে ৯ এপ্রিল ঢাকায় ডানপন্থী বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ এক সভায় মিলিত হয়ে ১০৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি ‘নাগরিক শান্তি কমিটি’ গঠন করেন। এ সভায় নিম্নলিখিত প্রস্তাব গৃহীত হয়।
 (১) ঢাকা শহর শান্তি কমিটির এ সভা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে ভারতীয় হস্তক্ষেপের তীব্র নিন্দা করছে।
(২) এ সভা দ্ব্যর্থহীনকণ্ঠে আরেকটি যুদ্ধ না বাধানোর জন্য ভারতের প্র্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করছে।
(৩) এ সভা মনে করে, ভারত সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারী পাঠিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের দেশপ্রেমকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
(৪) এ সভা দেশের সম্মান ও ঐক্য বজায় রাখতে দেশপ্রেমিক জনগণকে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আকুল আহ্বান জানাচ্ছে।
১৪ এপ্রিল কমিটির নাম পরিবর্তন করে নাম রাখা হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি।’ কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি তাদের কাজ দ্রুত ও যথোপযুক্তভাবে চালিয়ে যাওয়া ও তাদের নীতি পূর্ণ আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করার জন্য নিম্নলিখিত ২১-সদস্যবিশিষ্ট কার্যকরী কমিটি গঠন করে। (১) আহবায়ক সৈয়দ খাজা খয়েরউদ্দিন (২) একিউএম শফিকুল ইসলাম ( ৩) অধ্যাপক গোলাম আযম (৪) মাহমুদ আলী ( ৫) আবদুল জব্বার খন্দর ( ৬) মাওলানা সিদ্দিক আহমদ (৭) আবুল কাসেম (৮) মোহন মিয়া (৯) মাওলানা সৈয়দ মোহাম্মদ মাসুম (১০) আব্দুল মতিন (১১) অধ্যাপক গোলাম সরোওয়ার (১২) ব্যারিস্টার আখতারউদ্দিন (১৩) পীর মোহসীনউদ্দিন (১৪) এএসএম সোলায়মান (১৫) একে রফিকুল হোসেন (১৬) নূরুজ্জামান (১৭) আতাউল হক খান (১৮) তোয়াহা বিন হাবিব (১৯) মেজর আফসারউদ্দিন (২০) দেওয়ান ওয়ারাসাত আলী (২১) হাকিম ইরতেয়াজুল রহমান। 
কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির অফিস স্থাপন করা হয় মগবাজারস্থ ৫ নম্বর এলিফ্যাণ্ট লেনে। জেলা, মহকুমা, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে শান্তি কমিটির শাখা প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। শান্তি কমিটিকে বলা হতো ‘পিস কমিটি।’

রাজাকার বাহিনী
লে. জেনারেল টিক্কা খান ১৯৭১ সালের পহেলা জুন ‘পূর্ব পাকিস্তান রাজাকার অর্ডিন্যান্স’ ‘৭১ জারি করেন। এই অর্ডিন্যান্স জারির পর ১৯৫৮ সালের আনসার অ্যাক্ট বাতিল করা হয়। ১৯৭১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত অধ্যাদেশের আওতায় রাজাকার বাহিনীকে আধাসামরিক বাহিনী হিসাবে পুনর্গঠন করা হয়। মেজর জেনারেল জামশেদ ছিলেন রাজাকার বাহিনীর কমান্ডে। তিন থেকে চার হাজার স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে এক একটি রাজাকার ব্রিগেড গঠন করা হতো। প্রতিটি রাজাকার ব্রিগেডকে দু’টি নিয়মিত পাকিস্তানি ব্রিগেডের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাদের অস্ত্রশস্ত্র ছিল হাল্কা। উপমহাদেশে ‘রাজাকার’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করা হয় ভারত বিভক্তির সময়। ১৯৪৭ সালে হায়দ্রাবাদ রাজ্যটি ভারতভুক্ত হয়। কিন্তু ঐ রাজ্যের নিজাম বাহাদুরের ইচ্ছে ছিল হয় স্বাধীন থাকা নয়তো পাকিস্তানে যোগ দেয়া। তিনি হায়দ্রাবাদকে স্বাধীন ঘোষণা করেন এবং তার রাজ্যটি রক্ষা করার জন্য একটি বাহিনী গঠন করেন। তিনি এ বাহিনীর নাম দিয়েছিলেন ‘রাজাকার’। পার্সী এই শব্দটির আভিধানিক অর্থ ‘স্বেচ্ছাসেবক।’ 
     রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা ছিল গ্রাম থেকে আসা অশিক্ষিত, খেটে খাওয়া মানুষ। রাজাকার হলে মাসে মাসে বেতন পাওয়া যাবে এবং এক সময় চাকরিটা স্থায়ী হবে এই প্রলোভন তাদের সামনে ছিল। আর চাকরি স্থায়ী হলে পুলিশের মতো কিছু ‘বাড়তি ইনকাম’ করা যাবে সে স্বপ্নও ছিল। আদর্শিক কারণে রাজাকার হয়েছে এমন দৃষ্টান্ত কম। মাদ্রাসার কিছু গরীব ছাত্রও রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। তারা দ্বিবিধ উদ্দেশ্যে রাজাকার হয়েছিল। প্রথমত : চাকরির সম্ভাবনা এবং দ্বিতীয়ত: পাকিস্তান রক্ষার তাগিদ।
কোথাও কোথাও প্রলুব্ধ করে কিংবা ভয়ভীতি দেখিয়েও রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। যারা বাধ্য হয়ে রাজাকার হয়েছিল তাদের কেউ কেউ নিজের অস্ত্রসহ পালিয়ে এসে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। আর যারা রাজাকারে যোগ দিয়ে লুটপাট এবং নারী ধর্ষণের সুযোগ পেয়েছে তারা ক্রমান্বয়ে অপকর্মের মাত্রা বৃদ্ধি করেছে।
জুনে রাজাকার বাহিনী গঠন করার পর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই বাহিনীর সদস্যরা গ্রামেগঞ্জে, শহরেবন্দরে, হাটবাজারে, পথেঘাটে সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার ও নিপীড়ন চালিয়েছে। (১) পাকিস্তানি সৈন্যদের ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধার অবস্থানের খবর পৌঁছে দেয়া ছিল তাদের দায়িত্ব। এই সুযোগে তারা ব্যক্তিগত বা পারিবারিক শত্র“কে মুক্তিযোদ্ধা বলে পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে তুলে দিয়েছে। (২) রাজাকারদের ক্যাম্প ছিল মূলত হাটবাজার, ফেরিঘাট, রেলব্রিজ, সড়ক সেতু, স্লুইস গেট, রেল স্টেশন প্রভৃতি স্থানে। (৩) রাজাকাররা হাটে ঢুকে নিত্যপ্রয়োজনীয় সকল জিনিসপত্র চাল, ডাল, লবণ, তেল, মাছ, মাংস, তরকারি, শাকসবজি ইত্যাদি নিয়ে যেতো। (৪) গ্রামে ঢুকে আর্মির নাম করে গরুছাগল, হাঁসমুরগি ইত্যাদি ধরে নিয়ে যেতো। (৫) পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে কিংবা নিজেদের ক্যাম্পে বাংকার তৈরির জন্য ইটবালি বহন করার কাজে কিংবা আর্মির গাড়ি চলাচলের সুবিধার জন্য গ্রামের রাস্তা মেরামতের প্রয়োজন হলে রাজাকাররা গ্রাম থেকে লোক সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করতো। রাস্তায় চলাচলকারী পথিককেও তারা এসব কাজ করতে বাধ্য করতো। আর্মির নির্দেশে রাস্তার পার্শ্ববর্তী জঙ্গল পরিষ্কার করার কাজে গ্রামের যুবক বৃদ্ধ সবাইকে বাধ্য করা হতো।

আল-বদর বাহিনী
রাজাকার বাহিনী গঠনের পর আল-বদর বাহিনী গঠন করা হয়। তবে রাজাকারের অধ্যাদেশের মতো তাদের কোনো আইনগত ভিত্তি ছিল না। ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধের পটভূমি স্মরণে আল-বদর নামকরণ করা হয়। পাকিস্তানি মেজর রিয়াজ হোসেন আল-বদর গ্র“পের প্রথম ব্যাচের সমাপনী অনুষ্ঠানে এ বাহিনীর নামকরণ করেন। মাদ্রাসার ছাত্র, শিক্ষক, মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী প্রভৃতি ডানপন্থী দলগুলোর বাঙালি সমর্থকদের নিয়ে এ বাহিনী গঠন করা হয়। মোহাজির বিহারীরাও এ বাহিনীতে শামিল হয়। তারা অ্যাশ কালারের প্যান্ট ও খাকি শার্ট পরতো। বদর বাহিনীর দায়িত্ব ছিল (১) অপারেশনে অংশগ্রহণ (২) মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরি (৩) জিজ্ঞাসাবাদ (৪) নিয়মিত সেনাবাহিনীর গাইড হিসাবে কাজ করা (৫) গুপ্ত হত্যা (৬) মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বের করা (৭) অগ্রবর্তী সৈন্যদের সাপ্লাই লাইন হিসাবে কাজ করা। এ বাহিনীকে ‘ডেথ স্কোয়াড’ হিসাবে গড়ে তোলা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের শেষ প্রহরে আল- বদর বাহিনীর সদস্যরা দেশের সেবা বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীদের চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে প্রথমে মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে নির্মম দৈহিক নির্যাতনের পর রায়েরবাজার বধ্যভূমি ও মিরপুর গোরস্তানে নিয়ে হত্যা করে। ১৬ ডিসেম্বর আল-বদর আত্মসমর্পণ করে। বাঙালিরা তাদেরকে বিশ্বাসঘাতক হিসাবে চিহ্নিত করে। বদর বাহিনীকে যুদ্ধবন্দি করা হয়নি। তবে এ বাহিনীর বহু সদস্যকে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয় অথবা কারারুদ্ধ কর হয়। নতুবা দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। ১৯৭৩ সালে মুজিব সরকার তাদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা মঞ্জুর করে। 

আল-শামস বাহিনী
আল-শামস বাহিনী গঠন করা হয়েছিল প্রধানত অবাঙালি বিহারীদের নিয়ে। ‘শামস’ একটি আরবী শব্দ যার অর্থ সূর্য। আল শামস বাহিনীর দায়িত্ব ছিল বদর বাহিনীর অনুরূপ। এ বাহিনীও ডেথ স্কোয়াড হিসাবে কাজ করেছে। আল-শামস বাহিনী পুরোপুরি সক্রিয় হওয়ার আগেই মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়ে যায়।  

বিহারী সম্প্রদায়
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এদেশে বসবাসরত বিহারী সম্প্রদায় পাকিস্তান বাহিনীকে সমর্থন দেয়। রাজাকার বাহিনীর অধিকাংশ সদস্য ছিল বিহারী। ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভক্তির সময় শরণার্থী হিসাবে তারা নিরাপত্তা লাভের আশায় ভারতের বিহার থেকে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে অভিবাসন করে। তাদের মনে ১৯৪৬ সালে বিহারের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং ব্রিটিশ ভারতে হিন্দু জমিদারদের নির্যাতনের অমোচনীয় স্মৃতি দগদগ করছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অকুণ্ঠ সমর্থন দেখে তারা ভয় পেয়ে যায়। এ ভয় তাদেরকে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী অবস্থান নিতে বাধ্য করে। তাদের অবস্থা হয়েছিল ডাঙ্গায় বাঘ পানিতে কুমির থাকার মতো।
সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি পাকিস্তান সরকার বিশ্ববাসীকে ধোঁকা দেয়ার জন্য পূর্ব পাকিস্তানে বেসামরিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠার এক কৌশল অবলম্বন করে। ডা. এ.এম. মালিককে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসাবে নিয়োগ দান করা হয় এবং ১০ সদস্যবিশিষ্ট একটি মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়। বিচারপতি বিএ সিদ্দিকী ডা. মালিককে গভর্নর হিসাবে শপথ বাক্য পাঠ করান। ডা. মালিক ১৮ সেপ্টেম্বর তার মন্ত্রিসভা গঠন করেন। তাদের নাম ও দপ্তরের বিবরণ নিচে দেয়া হলো:
আবুল কাশেম অর্থ
আব্বাস আলী খান শিক্ষা
আখতারউদ্দিন আহমদ বাণিজ্য ও শিল্প এবং আইন ও পার্লামেন্ট
এএসএম সোলায়মান শ্রম, সমাজকল্যাণ ও পরিবার পরিকল্পনা
আউং শু প্র“ বন, সমবায় ও মৎস্য এবং সংখ্যালঘু বিষয়
মাওলানা একেএম ইউসুফ রাজস্ব, পূর্ত, বিদ্যুৎ ও সেচ দপ্তর
মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক মৌলিক গণতন্ত্র ও স্থানীয় সরকার
নওয়াজিশ আহমদ খাদ্য ও কৃষি
মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ মজুমদার স্বাস্থ্য
অধ্যাপক শামসুল হক সাহায্য ও পুনর্বাসন।
জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের শূন্য আসনগুলোতে উপনির্বাচন অনুষ্ঠানের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ঘোষণা অনুযায়ী জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের শূন্য আসনে মনোনয়নপত্র জমা দানের তারিখ যথাক্রমে ২০ ও ২১ অক্টোবর এবং নির্বাচনের তারিখ যথাক্রমে ১২ থেকে ২৩ ডিসেম্বরের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে বলে ধার্য করা হয়। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের অভিযোগে ৭৯ জন জাতীয় পরিষদ সদস্য ও ১৭৯ জন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের সদস্যপদ বাতিল করা হয় এবং তাদের অনুপস্থিতিতে বিচার করে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। উপ-নির্বাচনের জন্য ঘোষিত জাতীয় পরিষদের ৭৯ টি শূন্য আসনের ৫৮টিতে একজন করে প্রার্থী থাকায় তারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এই ৫৮ জনের দলভিত্তিক সংখ্যা ছিল :
জামায়াতে ইসলাম ১৫
পিডিপি ১২
মুসলিম লীগ (কনভেনশন) ৭
মুসলিম লীগ (কাইয়ুম) ৭
মুসলিম লীগ (কাউন্সিল) ৬
নেজামে ইসলাম ৬
পিপিপি ৫
মোট ৫৮
বাকি আসনে নির্বাচনের সুযোগ হয়নি। প্রাদেশিক পরিষদের শূন্য আসনেও নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগেই মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অর্জিত হয়। শুধু পূর্ব পাকিস্তানেই বেসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠার অভিনয় করা হয়নি, কেন্দ্রেও বেসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয়। ৬ ডিসেম্বর কেন্দ্রে পিডিপি ও পিপিপি’র কোয়ালিশন সরকার গঠন করা হয়। এ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হন নূরুল আমীন এবং জুলফিকার আলী ভুট্টো নিযুক্ত হন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে। অক্টোবরে রাজনৈতিক দলগুলোর উপর ২৬ মার্চ আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। শাহ আজিজুর রহমানের নেতৃত্বে জাতিসংঘে প্রতিনিধি প্রেরণ করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে দেশের প্রায় সকল অফিস আদালত জনশূন্য হয়ে পড়ে। সরকার ২১ এপ্রিল জারিকৃত এক প্রেসনোটের মাধ্যমে সরকারি কর্মচারিদের কাজে যোগদানের নির্দেশ দেয়। একইদিন অন্য একটি ঘোষণায় তাজউদ্দিন আহমদ, তোফায়েল আহমেদ, এসএম নজরুল ইসলাম, আবদুল মান্নান ও আবিদুর রহমানকে ঢাকাস্থ সামরিক কর্তৃপক্ষের নিকট হাজির হওয়ার নির্দেশ জারি করা হয়।
১৪ মে এক ঘোষণায় কর্নেল ওসমানীকে ২০ মে উপ-সামরিক আইন প্রশাসকের সামনে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। পহেলা জুন সমস্ত সরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দকে কাজে যোগদান এবং ২ আগস্ট থেকে ক্লাস শুরু এবং পহেলা জুলাই থেকে বেসরকারি কলেজের শিক্ষকবৃন্দকে কাজে যোগদানের নির্দেশ দেয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাসে একটি কমিটি গঠন করা হয় এবং ৩১ আগস্টের মধ্যে রিপোর্ট করতে বলা হয়। ২১ আগস্ট এক বিজ্ঞপ্তিতে রাজশাহী বিভাগের ১৪ জন এমএনএ এবং ২১ আগস্ট চট্টগ্রাম বিভাগের ১৩ জন এমএনএকে সামরিক আদালতে হাজির হতে নির্দেশ দেয়া হয়। ২৪ আগস্ট এক ঘোষণায় বলা হয়, আওয়ামী লীগ দলীয় ৮৮ জন এমএনএ এবং ৯৪ জন এমপিএ’র সদস্যপদ বহাল রাখা হয়েছে। ২৮ আগস্ট এসব এমএনএ এবং এমপিদের নির্ভয়ে দেশে ফিরে আসার জন্য আহ্বান জানানো হয়। পহেলা সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হিসাবে টিক্কা খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন অধ্যাপক যথাক্রমে ড. মনিরুজ্জামান (বাংলা বিভাগ), ড. এনামুল হক (বাংলা বিভাগ) ও ড. এবিএম হাবিবুল্লাহ (ইসলামের ইতিহাস বিভাগ) কে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেন। ৩ সেপ্টেম্বর আরেক আদেশে ড. মুনির চৌধুরী (বাংলা বিভাগ), ড. নীলিমা ইব্রাহিম (বাংলা বিভাগ) ও ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী (ইংরেজি বিভাগ)কে হুঁশিয়ার করে দেয়া হয়। ৩ সেপ্টেম্বর বাংলা বিভাগের অস্থায়ী প্রভাষক পদে কর্মরত শিক্ষক সৈয়দ আকরাম হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ২ সেপ্টেম্বর সামরিক আইন প্রশাসকের দপ্তর থেকে জারিকৃত এক আদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ জন অধ্যাপক, ১৩ জন উচ্চপদস্থ সিভিল কর্মকর্তা, ৪৮ জন এমপি এবং ৩ সেপ্টেম্বর ১৪৫ জন এমপি ও ৪৪ জন ইপিসিএস অফিসারকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। ২১ সেপ্টেম্বর প্রবাসে বাংলাদেশ আন্দোলনে তৎপর বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে পাকিস্তানের সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। ফরেন সার্ভিসের ৮ জনকে ২৫ সেপ্টেম্বর বরখাস্ত করা হয়। এভাবে পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসন, অফিস আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জীবনযাত্রা সচল করার নিষ্ফল প্রয়াস চালানো হয়।  
(লেখাটি  ‘২৬৭ দিনের মুক্তিযুদ্ধ’ থেকে নেয়া। বইটি প্রকাশ করেছে আফসার ব্রাদার্স)

১৯৭১ সালে স্থলযুদ্ধ

পূর্ব পাকিস্তানে ভারতের সামরিক অভিযানের সাংকেতিক নাম ছিল ‘অপারেশন ক্যাকটাস লিলি।’ মানেকশর পরামর্শ অনুযায়ী ঘোষণা দেয়া ছাড়া ২১ নভেম্বর যুদ্ধ শুরু হয়। দিনটি ছিল ঈদুল ফিতরের দিন। ধারণা করা হয়েছিল যে, পূর্ব পাকিস্তানে মোতায়েন পাকিস্তানি সৈন্যরা ঈদ উদযাপনে ব্যস্ত থাকবে। তাই দিনটিকে অনানুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ শুরু করার দিন হিসাবে বেছে নেয়া হয়। সেদিন হেলিকপ্টারের সহায়তা নিয়ে একটি ভারতীয় ব্রিগেড পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে এবং পাকিস্তানি সীমান্ত চৌকি তছনছ করে দিয়ে ১০ মাইল ভেতরে ঢুকে পড়ে। একইদিন ভারতের ২৩তম ডিভিশনের আরেকটি ব্রিগেড নোয়াখালী জেলার বিলোনিয়ায় হামলা চালিয়ে পূর্ব পাকিস্তান ভূখণ্ডের ৮ মাইল অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। ভারতের ৫৭তম ডিভিশনের একটি ব্যাটালিয়ন তৎকালীন ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার মুকন্দপুর ও সালদান্দিতে দু’টি পাকিস্তানি সীমান্ত চৌকিতে হামলা চালায়। ভারতের কাছে এ দু’টি সীমান্ত চৌকির পতন ঘটে। সিলেট জেলার তৎকালীন মৌলভীবাজার মহকুমায় দু’টি ভারতীয় ব্যাটালিয়ন ধলাই, আথিরাম ও জকিগঞ্জে সীমান্ত চৌকি দখল করে নেয়। এ দু’টি ব্যাটলিয়নে দু’টি গুর্খা কোম্পানি ছিল। রংপুরের ভুরঙ্গামারিতে একটি ভারতীয় ব্রিগেড হামলা চালিয়ে ১৫ মাইল ভেতরে নাগেশ্বরী পর্যন্ত এগিয়ে আসে। সাঁজোয়া ও বিমান বাহিনীর সহায়তা নিয়ে ভারতের নবম ডিভিশনের একটি ব্রিগেড যশোর জেলায় বড় ধরনের একটি হামলা চালায়। চৌগাছার বিপরীতে এ হামলা চালানো হয়। পূর্ব পাকিস্তানকে কয়েকটি অংশে বিভক্ত করে ফেলার লক্ষ্যে সকল ফ্রন্টে আক্রমণ পরিচালনার পর যত দ্রুত সম্ভব ঢাকা দখলের পরিকল্পনা করা হয়।
পুরনো মডেলের বিশেষ করে এম-২৪ এবং পিটি-৭৬ ট্যাংকের অধিকাংশ মোতায়েন করা হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানে। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে ভারতের কাছ থেকে এসব ট্যাংক দখল করা হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ছিল চারটি ডিভিশন। এসব ডিভিশনে ছিল ৪০ ব্যাটালিয়ন পদাতিক সৈন্য। পূর্ব পাকিস্তানের চারটি ডিভিশনকে সহায়তা দিতো দু’টি হাল্কা সাঁজোয়া ইউনিট। এ অঞ্চলে মোতায়েন নবম ডিভিশন ভারতের দ্বিতীয় কোরের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। পদ্মা ও যমুনা নদীর মাঝামাঝি অবস্থান গ্রহণ করেছিল পাকিস্তানের ষোড়শ ডিভিশন। এ ডিভিশনের বিপরীতে ছিল ভারতের ৩৩তম কোর। ভারতের চতুর্থ কোরের বিপরীতে ছিল পাকিস্তানের ৩৬তম ডিভিশন। উত্তরাঞ্চলে ভারতের ১০১তম কমিউনিকেশন জোনের বিপরীতে পাকিস্তানের ছিল ষোড়শ পদাতিক ডিভিশন। 
উত্তরাঞ্চলীয় সেক্টরে হিলি-বগুড়া এলাকায় ভারতের ৩৩তম কোরের সহায়তায় একটি টি-৫৫ ট্যাংক রেজিমেন্ট মোতায়েন করা হয়। পশ্চিমাঞ্চলে ভারতের দ্বিতীয় কোরকে সহায়তা করছিল পিটি-৭৬ এর একটি রেজিমেন্ট। পূর্বদিক থেকে হামলায় চতুর্থ কোরকে সহায়তা করছিল তিনটি স্বতন্ত্র সাঁজোয়া স্কোয়াড্রন। একটি ছিল পিটি-৭৬, আরেকটি এএমএক্স-১৩ এবং অন্যটি ফেরেট সাঁজোয়া স্কোয়াড্রন। পক্ষান্তরে বগুড়া এলাকায় ভারতের টি-৫৫ ট্যাংক বহরের বিপরীতে পাকিস্তানের ছিল একটি এম-২৪ শ্যাফি সাঁজোয়া রেজিমেন্ট। পশ্চিমাঞ্চল এবং ঢাকা সেক্টরকে সহায়তা দিচ্ছিল দু’স্কোয়াড্রন শ্যাফি ট্যাংক। সর্বাত্মক লড়াই শুরু হলে পূর্ব পাকিস্তানে মোতায়েন পাকিস্তানের অর্ধেক ট্যাংক হয়তো ধ্বংস হয়ে যায় নয়তো ভারতীয়দের হাতে আটক হয়। ততক্ষণে ভারতীয় সৈন্যরা ঢাকার উপকণ্ঠে পৌঁছে যায়। অবশিষ্ট ট্যাংকগুলো আত্মসমর্পণের শর্ত অনুযায়ী ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কমপক্ষে ৩০টি ভারতীয় পিটি-৭৬ ট্যাংক ধ্বংস অথবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাইন বিস্ফোরণে চারটি টি-৫৫ ট্যাংকের চাকা উড়ে যায়। তবে যুদ্ধের পর ১১ টি ছাড়া সব ক’টি ট্যাংক মেরামত করা হয়। এএমএক্স-১৩ ট্যাংককে তেমন একটা যুদ্ধে জড়িত হতে হয়নি। কোনো ফেরেট ট্যাংক ধ্বংস হয়নি। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো যে, ভারতের সপ্তম লাইট ক্যাভালরি ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে খোয়া যাওয়া তাদের একটি ট্যাংক পুনরুদ্ধারে সক্ষম হয়। চারদিক থেকে চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় ৬ ডিসেম্বর ব্রিগেডিয়ার হায়াতের নেতৃত্বে পাকিস্তানের ১০৭তম ব্রিগেডকে যশোর থেকে প্রত্যাহার করা হয়। এ ব্রিগেড দৌলতপুর, খুলনা ও মধুমতি নদীর পূর্ব তীরে পুনরায় অবস্থান গ্রহণ করে। খালি পেয়ে ভারতের নবম ডিভিশন ৭ ডিসেম্বর বিকেলে যশোরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। যুদ্ধে প্রথম যশোর মুক্ত হয়।
ডিসেম্বরের শুরুতে মেজর মইনের নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় ইস্ট বেঙল রেজিমেন্ট আখাউড়ায় পাকিস্তানি সৈন্যদের উপর কয়েকটি মারাত্মক আঘাত হানলে ভারতীয় সৈন্যদের ঢাকা অভিমুখে এগিয়ে যাবার পথ প্রশস্ত হয়। মেজর মইন আজমপুর দখল করে আশুগঞ্জ অভিমুখী রাস্তা মুক্ত করলে ভারতীয় বাহিনী এগিয়ে আসার সুযোগ পায় এবং তারা  আশুগঞ্জের কাছে পাকিস্তান সৈন্যদের সঙ্গে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। ব্রিগেডিয়ার মিশ্র মেজর মইনকে নরসিংদীতে অবস্থান করার এবং ভারতীয় সৈন্যদের ঢাকা এগিয়ে যাবার সময় তাদের পেছন দিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। মেজর মইন ব্রিগেডিয়ার মিশ্রর নির্দেশ অমান্য করে ঢাকা অভিমুখে অগ্রসর হন।
 মেঘনা নদী অতিক্রমের সাংকেতিক নাম ছিল ‘মেঘনা হেলি ব্রিজ।’ ৯ ডিসেম্বর এ অপারেশন পরিচালনা করা হয়। ভারতের চতুর্থ কোর কমান্ডার লে. জেনারেল সগৎ সিং উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, ভৈরব সেতু অতিক্রম করতে পারলে ঢাকা পর্যন্ত তার সামনে উল্লেখযোগ্য কোনো বাধা থাকবে না। আকাশ থেকে গৃহীত চিত্রে তিনি দেখতে পান, ভৈরব সেতু উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তখন হিসাব করা হয় যে, বিশাল মেঘনা বক্ষে একটি নয়া সেতু নির্মাণে আর্মি ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের প্রয়োজন হবে এবং শক্তিপ্রয়োগের চেষ্টা করা হলে বিপুল প্রাণহানি ঘটবে। এ পরিস্থিতিতে জেনারেল সগৎ ও ভারতের ৫৭তম মাউন্টেন ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল বিএফ গঞ্জালভেস হেলিকপ্টার যোগে সৈন্য পারাপারের সিদ্ধান্ত নেন। মেঘনা নদী অতিক্রমের সময় ভারতীয় সৈন্যদের গোলন্দাজ ও সাঁজোয়া বাহিনীর সহায়তা ছিল না। ৯ ডিসেম্বর ভারতীয়রা আশুগঞ্জের দক্ষিণে রায়পুরায় অবতরণ করতে থাকে। রায়পুরায় নিজেদের অবস্থান সংহত হলে ভারতীয় সৈন্যদের নরসিংদীতে বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়। গ্র“প ক্যাপ্টেন চন্দ্র সিং নদী পারাপারে নেতৃত্ব দেন। তিনি এমআই-৪ হেলিকপ্টার ব্যবহার করেন। ৯ ডিসেম্বর রাতে ভারতীয় বিমান বাহিনী পুরো ৩১১ ব্রিগেডকে নদীর পশ্চিম পাড়ে বহন করে নিয়ে যায়। পরবর্তী ৩৬ ঘণ্টায় ১১০ বার কপ্টার উড্ডয়ন করে। একটি এমআই-৪ সাধারণত ১৪ জন করে সৈন্য বহন করতে পারতো। কিন্তু সেদিন সৈন্য বহন করা হয় ২৩ জন করে। একইসময়ে ভারতের ৭৩তম ব্রিগেড নৌকা ও নৌযানে করে মেঘনা নদী পাড়ি দেয়। নরসিংদীতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ভারতীয় সৈন্যরা ১৪ ডিসেম্বর দাউদকান্দি এবং ১৫ ডিসেম্বর বৈদ্যেরবাজার মুক্ত করে। এ পর্যায়ে ভারতীয় সৈন্যদের সামনে ঢাকা অভিমুখী মহাসড়ক উন্মুক্ত হয়ে যায়। হুমকি দেখা দেয়া না সত্ত্বেও ভৈরব সেতু উড়িয়ে দেয়ায় ব্রিগেডিয়ার সাদুল্লাহর নেতৃত্বে একটি পাকিস্তানি ব্রিগেড আশুগঞ্জে কার্যকরভাবে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। মৌলভীবাজারে মোতায়েন পাকিস্তানের ৩১১তম পদাতিক ব্রিগেড ঢাকার প্রতিরক্ষায় এগিয়ে না এসে সিলেটে পিছু হটে। ৩১১তম ব্রিগেড ছিল পাকিস্তানের নবম ডিভিশনের অংশ। এ ডিভিশনের কমান্ডার ছিলেন মেজর জেনারেল কাজী আবদুল মজিদ। তাকে ঢাকায় পিছু হটার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। ভারতীয়রা রেলপথ দখল করে নেয়ায় সৈন্য পারাপারে তাকে ৬টি ফেরিও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি নির্দেশ অমান্য করেন। ভারতীয় সৈন্যরা মেঘনা নদী অতিক্রম করার সময় তার সৈন্যরা চেয়ে চেয়ে দেখছিল। মেঘনা নদী উন্মুক্ত হয়ে গেলে ঢাকার প্রতি মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। জেনারেল নিয়াজি নবম ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল কাজী আবদুল মজিদকে কমান্ড থেকে অব্যাহতি দেন। কিন্তু ততক্ষণে যা হবার হয়ে যায়। এ ধাক্কা সামলানো সম্ভব হয়নি। যুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করায় জেনারেল নিয়াজি অন্য কাউকে মেজর জেনারেল মজিদের স্থলাভিষিক্ত করতে পারেননি। তাই তিনি তার ডিভিশনকে ৩৬ এডহক ডিভিশনের আওতায় ন্যস্ত করেন।
মেঘনা নদী অতিক্রম সম্পন্ন হলে ১১ ডিসেম্বর টাঙ্গাইলে ভারতের ছত্রীসেনা অবতরণ করে। টাঙ্গাইলে ভারতীয় ছত্রীসেনাদের অবতরণের লক্ষ্য ছিল যমুনার পুঙ্গলি সেতু দখল করে উত্তরাঞ্চল থেকে পশ্চাদপসরণকারী ৯৩তম পাকিস্তানি ব্রিগেডের ঢাকার প্রতিরক্ষায় ছুটে আসা রোধ করা। ভারতের সেকেন্ড প্যারাশূট ব্যাটালিয়নকে ঢাকা অভিমুখে মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রির সঙ্গে সংযোগ সাধনের দায়িত্ব দেয়া হয়। ছত্রীসেনা অবতরণে নেতৃত্ব দেন লে. কর্নেল কুলবন্ত সিং। টাঙ্গাইলে ভারতীয় ছত্রীসেনা অবতরণে একাদশ ও ৪৮তম স্কোয়াড্রনের এএন-১২, সি-১১৯, ক্যারিবু ও ডাকোটা বিমান অংশগ্রহণ করে। সর্বমোট এক হাজার সৈন্য বিমান থেকে প্যারাশূটের সাহায্যে অবতরণ করে। সৈন্য অবতরণে ২২ নম্বর স্কোয়াড্রনের ন্যাট ছত্রছায়া প্রদান করে। ভারতের সেকেন্ড প্যারাশূট ব্যাটালিয়নের সঙ্গে একটি আর্টিলারি ব্যাটারি, একটি প্রকৌশল ডিটাচমেন্ট, একটি এডিএস, একটি সার্জিক্যাল টীম এবং ৫০তম স্বতন্ত্র প্যারাশূট ব্রিগেডের অন্যান্য সৈন্য যোগ দেয়। ১১ ডিসেম্বর বিকাল সাড়ে ৪টায় ভারতের ছত্রীসেনারা ভূমিতে প্রথম অবতরণ করে। ভূমিতে অবতরণ করে ছত্রীসেনারা একটি বিরাট এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ৩ শো পাকিস্তানি সৈন্য ভারতীয় ছত্রী সেনাদের চীনা সৈন্য ভেবে অভ্যর্থনা জানাতে গিয়ে বন্দি হয়ে যায়। ৯ ডিসেম্বর জেনারেল নিয়াজি সিগনাল নম্বর জি-১২৫৫-তে বিমানে করে অতিরিক্ত সৈন্য পাঠানোর জন্য অনুরোধ করেন। তার অনুরোধের কথাটি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হওয়ায় টাঙ্গাইলে মোতায়েন পাকিস্তানি সৈন্যরা এ ভুল করে। সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ ভারতীয় সৈন্যরা ৯৩তম পাকিস্তানি ব্রিগেডের ঢাকা অভিমুখে এগিয়ে আসা রোধ করে। মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রি টাঙ্গাইল সড়কে ধরে এগিয়ে আসে এবং পুঙ্গলি সেতুতে পৌঁছে যায়। পাকিস্তানি সৈন্যরা সেতুটি পুনর্দখলের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। টাঙ্গাইলে ভারতীয় ছত্রীসেনাদের অবতরণ ছিল পাকিস্তানের ৯৩ ব্রিগেডের পশ্চাদপসরণ রোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ভারতীয় ছত্রীসেনারা অবতরণ করায় টঙ্গী-ঢাকা ও মানিকগঞ্জ-ঢাকা মহাসড়ক উন্মুক্ত হয়ে যায়। ঢাকার উপকন্ঠে মিরপুর সড়ক অরক্ষিত হয়ে পড়লে পাকিস্তানি সৈন্যরা দ্রুত পরাজিত হওয়ার পথে ধাবিত হয়। 
জেনারেল নিয়াজির রণকৌশল ছিল ক্রটিপূর্ণ। তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করার জন্য সীমান্তের ৩৯০টি পয়েন্টে শক্তিশালী ঘাঁটিতে সৈন্য ও ভারি সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করে রেখেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে সীমান্তে তার মোকাবিলা হবে। এ ধারণা থেকে তিনি দেশের ভেতরে সৈন্য মোতায়েন রেখেছিলেন খুব সামান্য। ভারতীয়রা তার এ ক্রটিপূর্ণ কৌশলের পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করে। ভারতীয় সেনাবাহিনী সীমান্তে পাকিস্তানের শক্তিশালী ঘাঁটিগুলো এড়িয়ে সোজা রাজধানী ঢাকার দিকে ধেয়ে আসে। ভারতীয়দের এ চাল ছিল দাবা খেলায় রাজা খেয়ে ফেলার মতো। স্থল যুদ্ধে পাকিস্তানিরা ৪১ টি ট্যাংক, ৫০টি কামান/ ভারি মর্টার ও ১০৪টি রিকয়েললেস গান হারায়। অন্যদিকে ভারতের ধ্বংস হয় ২৪টি ট্যাংক এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১৩টি। 
(লেখাটি ‘২৬৭ দিনের মুক্তিযুদ্ধ’ থেকে নেয়া। বইটি প্রকাশ করেছে আফসার ব্রাদার্স।)

ফাইটার জেটের হেলমেট

বর্তমান সময়ে আধুনিক এবং নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ফিচার হচ্ছে জেট ফাইটারের ককপিটে বসা এর পাইলটের হেল...